কিবি-পরিচিতি :
আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মােড়াইল গ্রামে জন্মগ্রহণ
করেন। তাঁর প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি দীর্ঘকাল
সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। পরে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে
যােগদান করেন এবং পরিচালকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধ তাঁকে
বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। স্বাধীনতার পর তিনি দৈনিক গণকণ্ঠ পত্রিকার
সম্পাদক নিযুক্ত হন। তাঁর কবিতায় লােকজ শব্দের সুনিপুণ প্রয়ােগ যেমন
লক্ষণীয় তেমনি রয়েছে ঐতিহ্যপ্রীতি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : লােক
লােকানর, কালের কলস, সােনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, আরব্য রজনীর
রাজহাঁস, বখতিয়ারের ঘােড়া ইত্যাদি। কথাসাহিত্য : পানকৌড়ির রক্ত, পাখির
কাছে ফুলের কাছে তার শিশুতােষ কবিতার বই।
যে বাতাসে বুনােহঁসের ঋক ভেঙে যায়
জেটের পাখা দুমড়ে শেষে আছাড় মারে
নদীর পানি শূন্যে তুলে দেয় ছড়িয়ে
নুইয়ে দেয় টেলিগ্রাফের থামগুলােকে।
সেই পবনের কাছে আমার এই মিনতি
তিষ্ঠ হাওয়া, তিষ্ঠ মহাপ্রতাপশালী,
গরিব মাঝির পালের দড়ি ছিড়ে কী লাভ?
কী সুখ বলাে খুঁড়িয়ে দিয়ে চাষির ভিটে?
বেগুন পাতার বাসা ছিড়ে টুনটুনিদের
উল্টে ফেলে দুঃখী মায়ের ভাতের হাঁড়ি
হে দেবতা, বলাে তােমার কী আনন্দ,
কী মজা পাও বাবুই পাখির ঘর উড়িয়ে?
রামায়ণে পড়েছি যার কীর্তিগাথা
সেই মহাবীর হনুমানের পিতা তুমি?
কালিদাসের মেঘদূতে যার কথা আছে
তুমিই নাকি সেই দয়ালু মেঘের সাথী ?
তবে এমন নিষ্ঠুর কেন হলে বাতাস।
উড়িয়ে নিলে গরিব চাষির ঘরের খুঁটি
কিন্তু যারা লােক ঠকিয়ে প্রাসাদ গড়ে
তাদের কোনাে ইট খসাতে পারলে নাতাে।
হায়রে কতত সুবিচারের গল্প শুনি,
তুমিই নাকি বাহন রাজা সােলেমানের
যার তলােয়ার অত্যাচারীর কাটতাে মাথা
অহমিকার অট্টালিকা গুঁড়িয়ে দিতাে।
কবিদের এক মহান রাজা রবীন্দ্রনাথ
তােমার কাছে দাঁড়িয়েছিলেন করজোড়ে
যা পুরানাে শুষ্ক মরা, অদরকারি
কালবােশেখের একটি কুঁয়ে উড়িয়ে দিতে।
ধ্বংস যদি করবে তবে, শােনাে তুফান
ধবংস করাে বিভেদকারী পরগাছাদের
পরের শ্রমে গড়ছে যারা মৃস্ত দালান
বাড়তি তাদের বাহাদুরি গুড়িয়ে ফেলাে।
পাঠ-পরিচিতি : কবি
আল মাহমুদের কবিতা সমগ্র’ থেকে ‘বােশেখ’ কবিতাটি সংকলন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের একটি পরাক্রমশালী মাস বৈশাখ। ঋতুপরিক্রমায় বার বার সে রুদ্র
সংহারক রূপে আবির্ভূত হয়। বৈশাখের নিষ্ঠুর করাল গ্রাসে এবং আগ্রাসী থাবায়
কখনও কখনও লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় এক-একটা জনপদ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর শিকার
হয় দুঃখী দরিদ্র মানুষ বা অসহায় কোন প্রাণী। ছিড়ে যায় গরিব মাঝির পালের
দড়ি, উড়ে যায় দরিদ্র চাষির ঘর। ছােট্ট টুনটুনির বাসাও রেহাই পায় না।
কিন্তু ধনীর প্রাসাদের কোন ক্ষতি হয় না। কবি তাই আক্ষেপ করে বলছেন,
প্রকৃতির যত নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা কেন তা শুধু এই গরিবের বিরুদ্ধেই ঘটবে?
অবশেষে বৈশাখের কাছে তার আহ্বান, ধ্বংস যদি করতেই হয়, তাহলে গুঁড়িয়ে দাও
সেইসব অট্টালিকা যা গড়ে উঠেছে শ্রমজীবী সাধারণ মানুষকে শােষণ করে। এই
কবিতায় বৈশাখের বিধ্বংসী প্রতীকের মধ্য দিয়ে ও অত্যাচারীর অবসান কামনা
করছেন কবি।
সৃজনশীল প্রশ্ন -
বন্যার্ত মানুষের জন্য ত্রাণের আয়ােজন করা হয়। ত্রাণ কমিটি খুবই
কঠোরভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখে। হতদরিদ্র রাসুর পরিবারে লােকসংখ্যা বেশি
থাকায় দুইবার ত্রাণ নিতে এলে অনিয়মের দায়ে তার কার্ড বাতিল করা হয়।
বরাদ্দের চেয়ে কম চাল দেয়ার প্রতিবাদ করলে রহম আলীকে বেদম প্রহার করে
রিলিফ ক্যাম্প থেকে বের করে দেওয়া হয়। এমন সময় যতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী ও
শমসের আলী চৌধুরী এলে তাদের প্রত্যেককে এক মণ চাল, আধা মণ ডালসহ অন্যান্য
ত্রাণসামগ্রী নৌকায় পৌছে দিয়ে আসেন ত্রাণ কমিটির প্রধান কর্তাব্যক্তি।
ক. তিষ্ঠ কথার অর্থ কী?
খ. পবনের কাছে কবি মিনতি করেছেন কেন?
গ. উদ্দীপকে বর্ণিত দরিদ্র শ্রেণির সাথে রিলিফ কমিটির আচরণের মাধ্যমে ফুটে ওঠা দিকটি ‘বােশেখ’ কবিতার আলােকে ব্যাখ্যা কর।
ঘ, উদ্দীপকটি ‘বােশেখ’ কবিতার একটা খণ্ডচিত্র মাত্র, পূর্ণরূপ নয় – যুক্তিসহ বুঝিয়ে লেখ।

0 Comments