কিবি-পরিচিতি : সুকান্ত ভট্টাচার্য ৩০শে শ্রাবণ ১৩৩৩ বঙ্গাব্দে কলকাতার কালীঘাটে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস গােপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় । তার পিতা নিবারণচন্দ্র ভট্টাচার্য এবং মাতা সুনীতি দেবী। সুকান্ত বেলেঘাটা দেশবন্ধু স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে অকৃতকার্য হন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ধ্বংস ও মৃত্যুর তাণ্ডবলীলা কিশাের সুকান্তকে দারুণভাবে স্পর্শ করে। এছাড়া সামাজিক নানা অনাচার ও বৈষম্য তাঁকে প্রবলভাবে আলােড়িত করে। তার কবিতায় এই অনাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ধ্বনিত প্রবল প্রতিবাদ আমাদের সচকিত করে। নিপীড়িত গণমানুষের প্রতি গভীর মমতার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ : ছাড়পত্র, ঘুম নেই, পূর্বাভাস, অভিযান, হরতাল ইত্যাদি। ২৯শে বৈশাখ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দে মাত্র একুশ বছর বয়সে কৰি মৃত্যুবরণ করেন।
রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম্ ঘন্টা বাজছে রাতে
রানার চলেছে খবরের বােঝা হাতে,
রানার চলেছে, রানার!
রাত্রির পথে পথে চলে কোনাে নিষেধ জানে না মানার।
দিগন্ত থেকে দিগন্তে ছােটে রানার --
কাজ নিয়েছে সে নতুন খবর আনার ।
রানার! রানার!
জানা-অজানার
বােঝা আজ তার কাঁধে,
বােঝাই জাহাজ রানার চলেছে চিঠি আর সংবাদে;
রানার চলেছে, বুঝি ভাের হয় হয়,
আরাে জোরে, আরাে জোরে, এ রানার দুর্বার দুর্জয়।
তার জীবনের স্বপ্নের মতাে পিছে সরে যায় বন,
আরাে পথ, আরাে পথ - বুঝি হয় লাল ও পূর্ব কোণ।
অবাক রাতের তারারা, আকাশে মিটমিট করে চায়;
কেমন করে এ রানার সবেগে হরিণের মতাে যায়!
কত গ্রাম কত পথ যায় সরে সরে -
শহরে রানার যাবেই পৌঁছে ভােরে;
হাতে লণ্ঠন করে ঠনঠন, জোনাকিরা দেয় আলাে
মাভৈঃ রানার ! এখনাে রাতের কালাে।
এমনি করেই জীবনের বহু বছরকে পিছু ফেলে,
পৃথিবীর বােঝা ক্ষুধিত রানার পৌঁছে দিয়েছে ‘মেলে।
ক্লান্তশ্বাস ছুঁয়েছে আকাশ, মাটি ভিজে গেছে ঘামে
জীবনের সব রাত্রিকে ওরা কিনেছে অল্প দামে।
অনেক দুঃখে, বহু বেদনায়, অভিমানে, অনুরাগে,
ঘরে তার প্রিয়া একা শয্যায় বিনিদ্র রাত জাগে।।
রানার! রানার!
এ বােঝা টানার দিন কবে শেষ হবে?
রাত শেষ হয়ে সূর্য উঠবে কবে?
ঘরেতে অভাব; পৃথিবীটা তাই মনে হয় কালাে ধোঁয়া,
পিঠেতে টাকার বােঝা, তবু এই টাকাকে যাবে না ছোঁয়া,
রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছােটে
দস্যুর ভয়, তারাে চেয়ে ভয় কখন সূর্য ওঠে।
কত চিঠি লেখে লােকে
কত সুখে, প্রেমে, আবেগে, স্মৃতিতে, কত দুঃখে ও শশাকে।
এর দুঃখের চিঠি পড়বে না জানি কেউ কোনাে দিনও,
এর জীবনের দুঃখ কেবল জানবে পথের তৃণ,
এর দুঃখের কথা জানবে না কেউ শহরে ও গ্রামে,
এর কথা ঢাকা পড়ে থাকবেই কালাে রাত্রির খামে।
দরদে তারার চোখ কাপে মিটিমিটি,
এ-কে যে ভােরের আকাশ পাঠাবে সহানুভূতির চিঠি
রানার! রানার! কী হবে এ বােঝা বয়ে?
কী হবে ক্ষুধার ক্লান্তিতে ক্ষয়ে ক্ষয়ে?
রানার! রানার! ভাের তাে হয়েছে - আকাশ হয়েছে লাল
আলাের স্পর্শে কবে কেটে যাবে এই দুঃখের কাল?
রানার গ্রামের রানার
সময় হয়েছে নতুন খবর আনার;
শপথের চিঠি নিয়ে চলাে আজ
ভীরুতা পিছনে ফেলে -
পোঁছে দাও এ নতুন খবর,
অগ্রগতির মেলে,
দেখা দেবে বুঝি প্রভাত এখুনি
নেই, দেরি নেই আর, ছুটে চলল,
ছুটে চলাে, আরাে বেগে
দুর্দম, হে রানার ॥
শব্দার্থ ও টীকা :
রানার- ইংরেজি শব্দ ‘runner'-এর আভিধানিক অর্থ যিনি দৌড়ান। এখানে ‘ডাক
হরকরা' অর্থে ব্যবহৃত। নতুন খবর আনার ডাক হরকরার ব্যাগে মানুষের সুখ-দুঃখের
অনেক অজানা ও সংবাদ থাকে। চিঠি বিলি হলে সে সংবাদ মানুষ জানতে পারে। তাই
ডাক হরকরাকে নতুন খবরের বাহক বলা হয়েছে। দুর্বার-- যাকে নিবারণ করা যায়
না। হরিণের মতাে যায়। এটি একটি উপমা। হরিণ যেমন নিঃশব্দে কিন্তু অতি দ্রুত
দৌড়ায়, রানারও তেমনি। লণ্ঠন- হারিকেন বা তেল দিয়ে চালিত আলাের আধার।
ভাের তাে হয়েছে- আকাশ হয়েছে লাল- এটি প্রতীক। বাচ্যার্থে রাত্রির অন্ধকার
শেষ হয়ে আকাশে সূর্য উঠছে। কিন্তু প্রতীকী অর্থে কষ্টের কালিমা দূরীভূত
হয়ে সুখের সােনালি আলাে দেখা দিচ্ছে।
পাঠ -পরিচিতি : কবিতাটি
শ্রমজীবী মানুষ রানারদের নিয়ে লেখা। তাদের কাজ হচ্ছে গ্রাহকদের কাছে
ব্যক্তিগত ও প্রয়ােজনের চিঠি পৌছে দেওয়া। রানাররা এতটাই দায়িত্বশীল যে
কোনাে কিছুই তাদের কাজের বাধা হয়ে ওঠে না। রাত হােক, দুর্গম পথ হােক,
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া হােক - নিরন্তর তাদের এই কাজ করে যেতে হয়। চিঠি
মানেই সুখে-আনন্দে, দুঃখে-শােকে ভরা সংবাদ। এই সংবাদের জন্যেই অপেক্ষায়
থাকে প্রিয়জনরা। প্রিয়জনদের কাছে যথাসময়ে এই খবর পৌছে দেওয়া অত্যন্ত
জরুরি। রানারদের তাই ক্লান্তি নেই, অবসর নেওয়ার অবকাশ নেই। তারা ছুটছেন
তাে ছুটছেনই। এই মহান পেশায় যারা নিয়ােজিত রয়েছেন তারা যে মানুষ হিসেবে
কতটা মহৎ, কবিতাটিতে এই ভাবনারই প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
সৃজনশীল প্রশ্ন - সামাদ
সাহেব ব্যাংকে ক্যাশিয়ার হিসেবে ৩০ বছর যাবৎ কর্মরত আছেন। সবার আগে অফিসে
আসেন এবং সবশেষে অফিস ত্যাগ করেন। একদিন ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়ে
অপরাহ্বে তিনি বাড়ি যান। পরদিন যথাসময়ে তিনি পুনরায় ফিরে আসেন। তার
কারণে কারাে এতটুকু কষ্ট যাতে না হয় সে ব্যাপারে তিনি বেশ সচেতন।
ক. রানার ভােরে কোথায় পৌঁছে যাবে?
খ. ‘রাত নির্জন, পথে কত ভয়, তবুও রানার ছােটে। রানার কেন ছােটে?
গ. উদ্দীপকের সামাদ সাহেবের মাঝে ‘রানার কবিতার রানার চরিত্রের সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা কর।
ঘ. সামাদ সাহেব রানার চরিত্রের বিশেষ দিককে ধারণ করলেও রানার স্বতন্ত্র’- মন্তব্যটির যথার্থতা যাচাই কর।
0 Comments