শীতের সকাল। রােদে বসে আমি স্কুলের পড়া করছি, মা কাছে বসে ফুলকপি কুটছেন।
সে এসেই বলল, আপনার রান্নার জন্য তােক রাখবেন? আমি ছােট ছেলে-মেয়েও রাখব।
নিঃসঙ্কোচ আবেদন। বােঝা গেল সঙ্কোচ অনেক ছিল, প্রাণপণ চেষ্টায় অতিরিক্ত
জয় করে ফেলেছে। তাই যেটুকু সঙ্কোচ নিতান্তই থাকা উচিত তাও এর নেই।
বয়স আর কত হবে, বছর তেইশ। পরনে সেলাই করা ময়লা শাড়ি, পাড়টা বিবর্ণ লাল।
সীমান্ত পর্যন্ত ঘােমটা, ঈষৎ বিশীর্ণ মুখে গাঢ় শ্রান্তির ছায়া, স্থির
অচঞ্চল দুটি চোখ। কপালে একটি ক্ষত চিহ্ন-আন্দাজে পরা টিপের মতাে।
মা বললেন, তুমি রাঁধুনী?
চমকে তার মুখ লাল হলাে। সে চমক ও লালিমার বার্তা বােধহয় মার হৃদয়ে পৌছল, কোমল স্বরে বললেন, বােসাে বাছা।
সে বসল না। অনাবশ্যক জোর দিয়ে বলল, হ্যা আমি রাঁধুনী। আমায় রাখবেন? আমি রান্না ছাড়া ছােট ছােট কাজও করব।
মা তাকে জেরা করলেন। দেখলাম সে ভারি চাপা। মার প্রশ্নের ছাঁকা জবাব দিল,
নিজে থেকে একটি কথা বেশি কইল না। সে বলল, তার নাম মমতা। আমাদের বাড়ি থেকে
খানিক দূরে। জীবনময়ের গলি, গলির ভেতরে সাতাশ নম্বর বাড়ির একতলায় সে
থাকে। তার স্বামী আছে আর ও একটি ছেলে। স্বামীর চাকরি নেই চার মাস, সংসার
আর চলে না, সে তাই পর্দা ঠেলে উপার্জনের জন্য বাইরে এসেছে। এই তার প্রথম
চাকরি। মাইনে? সে তা জানে না। দুবেলা বেঁধে দিয়ে যাবে, কিন্তু খাবে না।
পনের টাকা মাইনে ঠিক হলাে। সে বােধহয় টাকা বারাে আশা করেছিল, কৃতজ্ঞতায়
দুচোখ সজল হয়ে উঠল। কিন্তু সমস্তটুকু কৃতজ্ঞতা সে নীরবেই প্রকাশ করল, কথা
কইল না।
মা বললেন, আচ্ছা, তুমি কাল সকাল থেকে এসাে। সে মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানিয়ে তৎক্ষণাৎ চলে গেল। আমি গেটের কাছে তাকে পাকড়াও করলাম।
শােন। এখুনি যাচ্ছ কেন? রান্নাঘর দেখবে না? আমি দেখিয়ে দিচ্ছি এসাে।
কাল দেখবাে, বলে সে এক সেকেন্ড দাঁড়াল না, আমায় তুচ্ছ করে দিয়ে চলে গেল।
ওকে আমার ভালাে লেগেছিল, ওর সঙ্গে ভাব করতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম, তবু,
আমি ক্ষুন্ন হয়ে মার কাছে গেলাম। একটু বিস্মিত হয়েও। যার অমন মিষ্টি গলা,
চোখে মুখে যার উপচে পড়া স্নেহ, তার ব্যবহার এমন রূঢ
মা বললেন, পিছনে ছুটেছিলি বুঝি ভাব করতে? ভাবিস না, তােকে খুব ভালােবাসবে। বার বার তোর দিকে এমন করে তাকাচ্ছিলাে।
শুনে খুশি হলাম। রাধুনী পদপ্রার্থিনীর স্নেহ সেদিন অমন কাম্য মনে হয়েছিল কেন বলতে পারি না।।
পরদিন সে কাজে এল। নীরবে নতমুখে কাজ করে গেল। যে বিষয়ে উপদেশ পেল পালন
করল, যে বিষয়ে উপদেশ পেল না নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করল-
অনর্থক প্রশ্ন করল না, নির্দেশের অভাবে কোনাে কাজ ফেলে রাখল না। সে যেন
বহুদিন এ বাড়িতে কাজ করছে বিনা আড়ম্বরে এমন নিখুঁত হলাে তার কাজ।
কাজের শৃঙ্খলা ও ক্ষিপ্রতা দেখে সকলে তাে খুশি হলেন, মার ভবিষ্যৎ বাণী সফল
করে সে যে আমায় খুব ভালােবাসবে তার কোনাে লক্ষণ না দেখে আমি হলাম ক্ষুণ।
দুবার খাবার জল চাইলাম, চার পাচ বার রান্নাঘরে গিয়ে দাড়ালাম, কিন্তু
কিছুতেই সে আমায় ভালােবাসল না। বরং রীতিমতাে উপেক্ষা করল । শুধু আমাকে নয়
সকলকে। কাজগুলিকে সে আপনার করে নিল, মানুষগুলির দিকে ফিরেও তাকাল না। মার
সঙ্গে মৃদুস্বরে দু একটি দরকারী কথা বলা ছাড়া ছটা থেকে বেলা সাড়ে দশটা
অবধি একবার কাশির শব্দ পর্যন্ত করল না। সে যেন ছায়াময়ী মানবী, ছায়ার
মতােই স্লানিমার ঐশ্বর্যে মহীয়সী কিন্তু ধরাছোঁয়ার অতীত শব্দহীন
অনুভূতিহীন নির্বিকার।
রাগ করে আমি স্কুলে চলে গেলাম। সে কি করে জানবে মাইনে করা রাঁধুনীর দূরে
থাকাটাই সকলে তার কাছে আশা করছে না, তার সঙ্গে কথা কইবার জন্য বাড়ির
ছােটকর্তা ছটফট করেছে!
সপ্তাহখানের নিজের নতুন অবস্থায় অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর সে আমার সঙ্গে ভাব করলো।
বাড়িতে সেদিন কুটুম এসেছিল, সঙ্গে এসেছিল এক গাদা রসগােল্লা আর
সন্দেশপ্রকাশ্য ভাগটা প্রকাশ্যে খেয়ে ভঁড়ার ঘরে গােপন ভাগটা মুখে পুরে
চলেছি, কোথা থেকে সে এসে খপ করে হাত ধরে ফেলল। রাগ করে মুখের দিকে তাকাতে
সে এমন ভাবে হাসল যে লজ্জা পেলাম।
বলল, দরজার পাশ থেকে দেখছিলাম, আর কটা খাচ্ছ গুনছিলাম। যা খেয়েছ তাতেই বােধহয় অসুখ হবে, আর খেয়াে না। কেমন?
ভৎর্সনা নয়, আবেদন। মার কাছে ধরা পড়লে বকুনি খেতাম এবং এক খাবলা খাবার
তুলে নিয়ে ছুটে পালাতাম। এর আবেদনে হাতের খাবার ফেলে দিলাম। সে বলল,
লক্ষ্মী ছেলে। এসাে জল খাবে।
বাড়ির সকলে কুটুম নিয়ে অন্যত্র ব্যস্ত ছিল, জল খেয়ে আমি রান্নাঘরে আসন
পেতে তার কাছে। বসলাম। এতদিন তার গম্ভীর মুখই শুধু দেখেছিলাম, আজ প্রথম
দেখলাম, সে নিজের মনে হাসছে।
আমি বললাম, বামুনদি
সে চমকে হাসি বন্ধ করল। এমন ভাবে আমার দিকে তাকাল যেন আমি তাকে গাল দিয়েছি। বুঝতে না পেরেও অপ্রতিভ হলাম।।
কি হলাে বামুনদি?
সে এদিক ওদিক তাকাল। ডালে খানিকটা নুন ফেলে দিয়ে এসে হঠাৎ আমার গা ঘেঁষে
বসে পড়ল। গম্ভীর মুখে বলল, আমায় বামুনদি বােলাে না খােকা। শুধু দিদি
বােলাে। তােমার মা রাগ করবেন। দিদি বললে?
আমি মাথা নাড়লাম। সে ছােট এক নিঃশ্বাস ফেলে আমাকে এত কাছে টেনে নিল যে আমার প্রথম ভারি লজ্জা করতে লাগল।
তারপর কিছুক্ষণ আমাদের যে গল্প চলল সে অপূর্ব কথােপকথন মনে করে লিখতে পারলে সাহিত্যে
হােক আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান লেখা হয়ে উঠত।
হঠাৎ মা এলেন। সে দুহাতে আমাকে একরকম জড়িয়েই ধরে ছিল, হাত সরিয়ে ধরা
পড়া চোরের মতাে হঠাৎ ব্রিত হয়ে উঠল, দুচোখে ভয় দেখা দিল। কিন্তু সে
মুহূর্তের জন্য। পরক্ষণে আমার কপালে চুম্বন করে মাকে বলল, এত কথা কইতে পারে
আপনার ছেলে।
তখন বুঝিনি, আজ বুঝি স্নেহে সে আমায় আদর করেনি, নিজের গর্ব প্রতিষ্ঠার
ললাভে। মা যদি বলতেন, খােকা উঠে আয়, যদি কেবল মুখ কালাে করে সরে যেতেন,
পরদিন থেকে সে আর আসত না। পনের টাকার খাতিরেও না, স্বামীপুত্রের অনাহারের
তাড়নাতেও না।
মা হাসলেন। বললে, ও ওইরকম। সারাদিন বকবক করে। বেশি আস্কারা দিও না, জ্বালিয়ে মারবে।
বলে মা চলে গেলেন। তার দুচোখ দিয়ে দুটো দুর্বোধ্য রহস্য টপ টপ করে ঝরে
পড়ল। মা অপমান করলে তার চোখ হয়তাে শুকনােই থাকত, সম্মানে, চোখের জল ফেলল!
সে সম্মানের আগাগােড়া করুণা ও দয়া মাখা ছিল, সেটা বােধহয় তার সইল না।
তিন চার দিন পরে তার গালে তিনটে দাগ দেখতে পেলাম। মনে হয়, আঙ্গুলের দাগ।
মাস্টারের চড় খেয়ে একদিন অবনীর গালে যে রকম দাগ হয়েছিল তেমনি। আমি
ব্যস্ত হয়ে প্রশ্ন করলাম, তােমার গালে আঙ্গুলের দাগ কেন? কে চড় মেরেছে?
সে চমকে গালে হাত চাপা দিয়া বলল, দূর। তারপর হেসে বলল, আমি নিজে মেরেছি! কাল রাত্রে গালে একটা মশা বসেছিল, খুব রেগে
মশা মারতে গালে চড়! বলে আমি খুব হাসলাম । সেও প্রথমটা আমার সঙ্গে হাসতে
আরম্ভ করে গালে হাত ঘষতে ঘষতে আনমনা ও গম্ভীর হয়ে গেল। তার মুখ দেখে আমারও
হাসি বন্ধ হয়ে গেল। চেয়ে দেখলাম, ভাতের হাঁড়ির বুদবুদফাটা বাষ্পে কি
দেখে যেন তার চোখ পলক হারিয়েছে, নিচের ঠোট দাঁতে দাঁতে কামড়ে ধরেছে,
বেদনায় মুখ হয়েছে কালাে।
সন্দিগ্ধ হয়ে বললাম, তুমি মিথ্যে বলছাে দিদি। তােমায় কেউ মেরেছে।
সে হঠাৎ কাঁদ কাঁদ হয়ে বলল, না ভাই, না। সত্যি বলছি না। কে মারবে?
এ প্রশ্নের জবাব খুঁজে না পেয়ে আমাকে চুপ করে থাকতে হলাে। তখন কি জানি তার
গালে চড় মারার অধিকার একজন মানুষের আঠার আনা আছে। কিন্তু চড় যে কেউ একজন
মেরেছে সে বিষয়ে আমার সন্দেহ ঘুচল না। শুধু দাগ নয়, তার মুখ চোখের ভাব,
তার কথার সুর সমস্ত আমার কাছে ওকথা ঘােষণা করে দিল। বিবর্ণ গালে তিনটি
রক্তবর্ণ দাগ দেখতে দেখতে আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমি গালে হাত বুলিয়ে
দিতে গেলাম কিন্তু সে আমার হাতটা টেনে নিয়ে বুকে চেপে ধরল। চুপি চুপি বলল,
কারাে কাছে যা পাই না, তুমি তা দেবে কেন?
আমি অবাক হয়ে বললাম, কি দিলাম আমি?
এ প্রশ্নের জবাব পেলাম না। হঠাৎ সে তরকারী নামাতে ভারি ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
পিঁড়িতে বসামাত্র খোপা খুলে পিঠ ভাসিয়ে একরাশি চুল মেঝে পর্যন্ত ছড়িয়ে
পড়ল কি একটা অন্ধকার রহস্যের আড়ালে সে যেন নিজেকে লুকিয়ে ফেলল।
রহস্য বৈকি। গালে চড়ের দাগ, চিরদিন যে ধৈর্যময়ী ও শান্ত তার ব্যাকুল
কাতরতা, ফিসফিস করে ছােট ছেলেকে শােনানাে; কারও কাছে যা পাই না তুমি তা
দেবে কেন? বুদ্ধির পরিমাণের তুলনায় এর চেয়ে বড় রহস্য আমার জীবনে কখনাে
দেখা দেয়নি! ভেবেচিন্তে আমি তার চুলগুলি নিয়ে বেণী পাকাবার চেষ্টা আরম্ভ
করে দিলাম। আমার আশা পূর্ণ হলাে সে মুখ ফিরিয়ে হেসে রহস্যের ঘােমটা খুলে
সহজ মানুষ হয়ে গেল।
বিকালে আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আচ্ছা, তােমার বরের চাকরি হলে তুমি কি করবে? ও
তুমি কি করতে বল? হরির লুট দেব? না তােমায় সন্দেশ খাওয়া।
ধেৎ তা বলছি না। তােমার বরের চাকরি নেই বলে আমাদের বাড়ি কাজ করছ, তা তাে চাকরি হলে করবে না?
সে হাসল, করব। এখন করছি যে!
তােমার বরের চাকরি হয়েছে।
হয়েছে বলে সে গম্ভীর হয়ে গেল।
আহা স্বামীর চাকরি নেই বলে দ্রলােকের মেয়ে কষ্টে পড়েছে, পাড়ার মহিলাদের
কাছে মার এই মন্তব্য শুনে মমতাদির বরের চাকরির জন্য আমি দুশ্চিন্তাগ্রস্ত
হয়ে উঠেছিলাম। তার চাকরি হয়েছে শুনে পুলকিত হয়ে মাকে সংবাদটা শুনিয়ে
দিলাম।
মা তাকে ডেকে পাঠালেন, তােমার স্বামীর চাকরি হয়েছে?
সে স্বীকার করে বলল, হয়েছে। বেশি দিন নয়, ইংরাজি মাসের পয়লা থেকে।
মা বললেন, অন্য লােক ঠিক করে দিতে পারছ না বলে কি তুমি কাজ ছেড়ে দিতে
ইতস্তত করছ? তার কোনাে দরকার নেই। আমরা তােমায় আটকে রাখব না। তােমার কষ্ট
দূর হয়েছে তাতে আমরাও খুব সুখী। তুমি ইচ্ছে করলে এবেলাই কাজ ছেড়ে দিতে
পার, আমাদের অসুবিধা হবে না ।
তার চোখে জল এল, সে শুধু বলল, আমি কাজ করব।
মা বললেন, স্বামীর চাকরি হয়েছে, তবু?
সে বলল, তার সামান্য চাকরি, তাতে কুলবে না মা। আমায় ছাড়বেন না। আমার কাজ কি ভালাে হচ্ছে না?
মা ব্যস্ত হয়ে বললেন, অমন কথা তােমার শত্রুও বলতে পারবে না মা। সেজন্য
নয়। তােমার কথা ভেবেই আমি বলছিলাম। তােমার ওপর মায়া বসেছে, তুমি চলে গেলে
আমাদেরও কি ভালাে লাগবে?
সে একরকম পালিয়ে গেল। আমি তার পিছু নিলাম। রান্নাঘরে ঢুকে দেখলাম সে কাঁদছে। আমায় দেখে চোখ মুছল।
আচমকা বলল, মিথ্যে বললে কি হয় খােকা?
মিথ্যে বললে কি হয় জানতাম। বললাম, পাপ হয়।
গুরুনিন্দা বাঁচাতে মিথ্যে বললে?
এটা জানতাম না। গুরুনিন্দা পাপ, মিথ্যা বলা পাপ। কোনটা বেশি পাপ সে জ্ঞান
আমার জন্মায়নি। কিন্তু না জানা কথা বলেও সান্ত্বনা দেওয়া চলে দেখে বললাম,
তাতে একটুও পাপ হয় না ।
সত্যি! কাঁদছ কেন?
তখন তার চাকরির এক মাস বােধহয় পূর্ণ হয়নি। একদিন স্কুল থেকে বাড়ি ফেরবার
সময়। দেখলাম জীবনময়ের গলির মােড়ে ফেরিওয়ালার কাছে কমলা লেবু কিনছে।
সঙ্গে নেবার ইচ্ছে নেই টের পেয়েও এক রকম জোর করেই বাড়ি দেখতে গেলাম। দুটি
লেবু কিনে আমাকে সঙ্গে নিয়ে সে গলিতে ঢুকল। বিশ্রী নােংরা গলি। কে যে
ঠাট্টা করে এই যমালয়ের পথটার নাম জীবনময় লেন রেখেছিল। গলিটা আস্ত ইট
দিয়ে বাঁধানাে, পায়ে পায়ে ক্ষয় হয়ে গেছে। দুদিকের বাড়ির চাপে
অন্ধকার, এখানে ওখানে আবর্জনা জমা করা আর একটা দূষিত চাপা গন্ধ। আমি
সঙ্কুচিত হয়ে তার সঙ্গে চলতে লাগলাম। সে বলল, মনে হচ্ছে পাতালে চলেছ, না?
সাতাশ নম্বরের বাড়িটা দোতলা নিশ্চয়, কিন্তু যত ক্ষুদ্র দোতলা হওয়া
সম্ভব। সদর দরজার পরেই ছােট একটি উঠান, মাঝামাঝি কাঠের প্রাচীর দিয়ে দুভাগ
করা। নিচে ঘরের সংখ্যা বােধহয় চার, কারণ মমতাদি আমায় যে ভাগে নিয়ে গেল
সেখানে দুখানা ছােট ছােট কুঠরির বেশি কিছু আবিষ্কার করতে পারলাম না। ঘরের
সামনে দুহাত চওড়া একটু রােয়াক, একপাশে একশিট করােগেট আয়রনের ছাদ ও চটের
বেড়ার অস্থায়ী রান্নাঘর। চটগুলি কয়লার ধোঁয়ায় কয়লার বর্ণ পেয়েছে।
সে আমাকে শােবার ঘরে নিয়ে গিয়ে টুলে বসাল। ঘরে দুটি জানালা আছে এবং
সম্ভবত সেই কারণেই শােবার ঘর করে অন্য ঘরখানার চেয়ে বেশি মান দেওয়া
হয়েছে। কিন্তু জানালা দুটির এমনি অবস্থান যে আলাে যদিও কিছু কিছু আসে,
বাতাসের আসা-যাওয়া একেবারে অসম্ভব। সুতরাং পক্ষপাতিত্বের যে খুব জোরালাে
কারণ ছিল তা বলা যায় না। সংসারের সমস্ত জিনিসই প্রায় এঘরে ঠাঁই পেয়েছে।
সব কম দামী শ্রীহীন জিনিস। এই শ্রীহীনতার জন্য সযত্নে গুছিয়ে রাখা
সত্ত্বেও মনে হচ্ছে বিশৃঙ্খলতার অন্ত নেই। একপাশে বড় চৌকি, তাতে গুটানাে
মলিন বিছানা। চৌকির তলে একটি চরকা আর ভাঙ্গা বেতের বাস্কেট চোখে পড়ে,
অন্তরালে হয়তাে আরও জিনিস আছে । ঘরের এক কোণে পাশাপাশি রক্ষিত দুটি
ট্রাংক- দুটিরই রঙ চটে গেছে, একটির তালা ভাঙ্গা। অন্য কোণে কয়েকটা মাজা
বাসন, বাসনের ঠিক ঊর্ধ্বে কোনাকুনি টাঙ্গানাে দড়িতে খানকয়েক কাপড়। এই
দুই কোণের মাঝামাঝি দেওয়াল ঘেঁষে পাতা একটি ভাঙ্গা টেবিল, আগাগােড়া দড়ির
ব্যান্ডেজের জোরে কোনমতে দাঁড়িয়ে আছে। টেবিলে কয়েকটা বই-খাতা, একটি
অল্প দামী টাইমপিস, কয়েকটা ওষুধের শিশি, একটা মেরামত করা আর্সি, কয়েকটা
ভঁজ করা সংবাদপত্র, এই সব টুকিটাকি জিনিস। টেবিলের ঊর্ধ্বে দেওয়ালের
গর্তের তাকে কতকগুলি বই।
ঘরে আর একটি জিনিস ছিল- একটি বছর পাঁচেকের ছেলে। চৌকিতে শুধু মাদুরের ওপরে
উপুড় হয়ে শুয়ে সে ঘুমিয়ে ছিল। মমতাদি ঘরে ঢুকেই ব্যস্ত হয়ে ছেলেটির
গায়ে হাত দিল, তারপর গুটানাে বিছানার ভেতর থেকে লেপ আর বালিশ টেনে বার
করল। সন্তর্পণে ছেলেটির মাথার তলে বালিশ দিয়ে লেপ দিয়ে গা ঢেকে দিল।
বলল, কাল সারারাত পেটের ব্যথায় নিজেও ঘুমােয়নি, আমাকেও ঘুমােত দেয়নি। উনি তাে রাগ করে-কই, তুমি লেবু খেলে না?
আমি একটা লেবু খেলাম। সে চুপ করে খাওয়া দেখে বলল, মুড়ি ছাড়া ঘরে কিছু
নেই, দোকানের বিষও দেব না, একটা লেবু খাওয়াতে তােমাকে ডেকে আনিলাম!
আমি বললাম, আর একটা লেবু খাব দিদি।
সে হেসে লেবু দিল, বলল, কৃতার্থ হলাম। সবাই যদি তােমার মতাে ভালােবাসত।
ঘরে আলাে ও বাতাসের দীনতা ছিল। খানিক পরে সে আমায় বাইরে বােয়াকে মাদুর
পেতে বসাল। কথা বলার সঙ্গে সংসারের কয়েকটা কাজও করে নিল। ঘর ঝাঁট দিল,
কড়াই মাজল, পানি তুলল, তারপর মশলা বাটতে বসল। হঠাৎ বলল, তুমি এবার বাড়ি
যাও ভাই। তােমার খিদে পেয়েছে।
শব্দার্থ ও টীকা : বাছা-
বৎস বা অল্পবয়সী সন্তান। পর্দা ঠেলে উপার্জন- এখানে নারীদের অন্তঃপুরে
থাকার প্রথাভঙ্গ করে বাইরে এসে আয়-রােজগার করা বােঝাচ্ছে। অনাড়ম্বর
জাকজমকহীন। বামুনদি ব্রাহ্মণদিদির সংক্ষিপ্ত রূপ। আগে রান্না বা গৃহকর্মে
যে ব্রাহ্মণকন্যাগণ নিয়ােজিত হতেন তাদের কথ্যরীতিতে বামুনদি ডাকা হতাে।
অপ্রতিভ- অপ্রস্তুত। পরদিন থেকে সে আর আসত না-- না আসার কারণ আত্মসম্মান।
মমতাদি টাকার জন্য অন্যের বাড়িতে কাজ নিয়েছে সত্য কিন্তু তাকে অসম্মান
করলে বা সন্দেহের চোখে দেখলে নিজে অপমান বােধ করে চাকরি ত্যাগের সাহস তার
ছিল। হরির লুট- ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দান করা। সংকীর্তনের পর হরির নামে যেভাবে
বাতাসা ছড়ানাে হয়।
পাঠ পরিচিতি : মানিক
বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরীসৃপ’ (১৯৩৯) গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত ‘মমতাদি' গল্প। এই
গল্পে গৃহকর্মে নিয়ােজিত মানুষের প্রতি মানবিক আচরণের দিকটি প্রাধান্য
পেয়েছে। স্কুল পড়ুয়া একটি ছেলে যখন দেখে তাদের বাড়িতে মমতাদি নামে এক
গৃহকর্মী আসে, তখন সে আনন্দিত হয়। তাকে নিজের বাড়ির একজন বলে ভাবতে শুরু
করে ছেলেটি। মমতাদির সংসারে অভাব আছে বলেই মর্যাদাসম্পন্ন ঘরের নারী হয়েও
তাকে অপরের বাড়িতে কাজ নিতে হয়। এই আত্মমর্যাদাবােধ তার সবসময়ই সমুন্নত
ছিল। সে নিজে যেমন আদর ও সম্মানপ্রত্যাশী, তেমনি অন্যকেও স্নেহ ও ভালােবাসা
দেবার ক্ষেত্রে তার মধ্যে দ্বিধা ছিল না। স্কুলপড়ুয়া ছেলেটি তাই মমতাদির
কাছে ছােট ভাইয়ের মর্যাদা লাভ করে। তাকে নিজ বাসায় নিয়ে গিয়ে
যথাসামর্থ্য আপ্যায়ন করে মমতাদি! সম্মান ও সহমর্মিতা নিয়ে মমতাদির পাশেও
দাঁড়ায় স্কুলপড়ুয়া ঐ ছেলে ও তার পরিবার। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের গৃহকর্মে
যারা সহায়তা করে থাকেন তাদের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা
জরুরি। আত্মসম্মানবােধ তাদেরও আছে। এই বােধকে মান্য করলে তারাও গৃহস্থের
পরিবারকে নিজ পরিবার হিসেবে গণ্য করবেন।
লেখক-পরিচিতি :
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯০৮ সালে বিহারের সাঁওতাল পরগনায় জনগ্রহণ করেন।
তার আসল নাম প্রবােধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর পিতার নাম হরিহর
বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মাতা নীরদাসুন্দরী দেবী। তাঁর পৈতৃক বাড়ি
মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর অঞ্চলের মালবদিয়া গ্রাম এবং মায়ের বাড়ি একই
অঞ্চলের গাওদিয়া গ্রাম। ১৯২৬ সালে তিনি মেদিনীপুর জিলা স্কুল থেকে
ম্যাট্রিক ও ১৯২৮ সালে বাঁকুড়া ওয়েসলিয় মিশন কলেজ থেকে আইএসসি পাস করেন।
তারপর গণিতে অনার্স নিয়ে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে বি, এসসি ক্লাসে
ভর্তি হন। কিন্তু বন্ধুদের সঙ্গে বাজি ধরে অতসীমামী নামক গল্প বিচিত্রা
পত্রিকায় প্রকাশিত হলে লেখক হিসেবে তাঁর নিয়তি নির্ধারিত হয়ে যায়। এ
সময় তিনি লেখা নিয়ে এতই মগ্ন থাকেন যে, অসাধারণ এই কৃতী ছাত্রের আর
অনার্স পাস করা হয়নি। মাত্র একুশ বছর বয়সে তিনি তাঁর বিখ্যাত
“দিবারাত্রির কাব্য রচনা করেন। এরপর তিনি লেখালেখিকেই জীবিকার একমাত্র
অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করেন। পদ্মা নদীর মাঝি ও পুতুল নাচের ইতিকথা লিখে
তিনি বাংলা কথাসাহিত্যের সিংহাসনে আরােহণ করেন। পঞ্চাশটিরও অধিক উপন্যাস
তিনি রচনা করেন। এর মধ্যে জননী, চিহ্ন, সহরতলী, অহিংস, চতুষ্কোণ তাঁর
উল্লেখযােগ্য উপন্যাস। ১৯৫৬ সালের ৩রা ডিসেম্বর এই মহান লেখক মৃত্যুবরণ
করেন।
সৃজনশীল প্রশ্ন
রাসেল ড্রাইভার হিসেবে যেমন দক্ষ তেমনি সৎ। প্রকৌশলী এমারত সাহেব তাকে
ব্যক্তিগত ড্রাইভার হিসেবে নিয়ােগ দেন। ইফতি, সনাম ও শিলাকে স্কুলে নিয়ে
যাওয়া-আসাই তার প্রধান কাজ। ঘরের সবাই ওকে ভীষণ ভালােবাসে। ইফতিরা ওকে
ভাইয়া বলে ডাকে, একসাথে খায়, গল্প করে, বেড়াতে যায়। রাসেলের প্রতি
সন্তানদের এই আচরণে এমারত সাহেব ভীষণ খুশি ।।
ক. মমতাদির বয়স কত ছিল?
খ. মমতাদির চোখ সজল হয়ে উঠেছিল কেন?
গ. উদ্দীপকে রাসেলের মাঝে বিদ্যমান মমতাদির বিশেষ গুণটি ব্যাখ্যা কর।
ঘ. রাসেল ও মমতাদির প্রতি দুই পরিবারের আচরণের ফুটে ওঠা দিকটি সামাজিক সংহতি সৃষ্টিতে কতটুকু প্রভাব ফেলে? যুক্তিসহ বিশ্লেষণ কর।
0 Comments