আমি সেই জগতে হারিয়ে যেতে চাই,
যেথায় গভীর-নিশুত রাতে।
জীর্ণ বেড়ার ঘরে।
নির্ভাবনায় মানুষেরা ঘুমিয়ে থাকে ভাই ।
যেথায় লােকে সােনা-রুপায়।
পাহাড় জমায় না,
বিত্ত-সুখের দুর্ভাবনায়
আয়ু কমায় না;
যেথায় লােকে তুচ্ছ নিয়ে
তুষ্ট থাকে ভাই ।
সারা দিনের পরিশ্রমেও।
পায় না যারা খুঁজে
একটি দিনের আহার্য-সঞ্চয়,
তবু যাদের মনের কোণে
নেই দুরাশা গ্লানি,
নেই দীনতা, নেই কোনাে সংশয়।
যেথায় মানুষ মানুষেরে
বাসতে পারে ভালাে
প্রতিবেশীর আঁধার ঘরে
জ্বালাতে পারে আলাে,
সেই জগতের কান্না-হাসির
অন্তরালে ভাই।
আমি হারিয়ে যেতে চাই ॥
শব্দার্থ ও টীকা :
আমি সেই জগতে ... ঘুমিয়ে থাকে ভাই - কে কীভাবে সুখী হবে তা নির্ধারিত
নয়। মানুষ গতানুগতিক যেভাবে সুখী হয় কবি সেভাবে সুখী হওয়ার কথা এখানে
বলেননি। সুখের চিন্তায় মানুষের রাতে ঘুম হয় না। কিন্তু সুখী মানুষের
ঘুমের সমস্যা হয় না। সারাদিন কাজের পর বিছানায় গেলেই শান্তির ঘুম তাকে
তৃপ্তি দেয়। কবিও তেমনি সে রকম এক জীবন-যাপনের মাঝে যেতে চান যেখানে ভাঙা
বেড়ার ঘরেও মানুষ নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে থাকে; ঘুমিয়ে যেতে পারে।
বিত্ত-সুখের ... কমায় না - সমাজের বেশির ভাগ মানুষ টাকা-পয়সা ও সম্পদের
লােভে দিনাতিপাত করে; এতে সুখ হারাম হয়ে যায়; জীবন হয় যন্ত্রণাময়। এতে
তাদের জীবন দীর্ঘ না হয়ে বিভিন্ন রােগ-বালাইয়ে তারা আক্রান্ত হয় এবং
মৃত্যুবরণ করে। বিত্ত-সুখের দুর্ভাবনা মানুষকে সুখ তাে দেয়ই না বরং তাদের
আয়ু আরও কমে যায়। যেথায় মানুষ ... জ্বালতে পারে আলো - জীবনের সার্থকতা
কোথায় এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কিছু মানুষ আছে যারা অন্যের উপকার ও
মঙ্গলের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে। মানবপ্রেম বা মানুষকে ভালােবাসতে
পারার মাঝে জীবনের মহত্ত্ব। নিহিত থাকে। প্রতিবেশীর দুঃখে এগিয়ে আসা,
তাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করার মাঝেও এক ধরনের তৃপ্তি আছে। কবি তাই বলেছেন যে,
যেখানে মানুষকে ভালােবাসা যায়, প্রতিবেশীর দুঃখ-কষ্ট দূর করে আলাে
জ্বালানাে যায় সেখানেই তিনি থাকতে চান।
পাঠ-পরিচিতি : সিকান্দার
আবু জাফরের ‘মালব কৌশিক কাব্যগ্রন্থ থেকে কবিতাটি সংকলিত হয়েছে। জাগতিক
এই পৃথিবী ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। মানুষ ক্রমশ আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে।
মানুষের সঙ্গে মানুষের বাড়ছে ব্যবধান। কারও মনেই যেন শান্তি নেই।
বিত্ত-বৈভব অর্জন করা আর সুখের দুর্ভাবনায় তাদের আয়ু কমে যাচ্ছে। কিন্তু
কবি এসব অতিক্রম করে যেতে চাইছেন সেইসব মানুষের কাছে যারা প্রকৃত অর্থেই
মানুষ। মনুষ্যত্বের আলাে যারা জ্বালিয়ে রেখেছেন। দরিদ্র হলেও এই মানুষ
বিত্তের পেছনে ছােটে না। সােনা-রুপার পাহাড় গড়ে তােলে না। জীর্ণ ঘরে
বসবাস করেও তারা সুখী। তুচ্ছ, ছােট ছােট আনন্দ অবগাহনেই কাটে তাদের দিন।
সারাদিন তারা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটে, তাতে হয়তাে একটি দিনের আহার্যও জোটে
না। তবু কোনাে দুরাশা বা গ্লানি তাদের গ্রাস করে না। কোনাে দীনতা বা সংশয়ে
তাদের জীবন ক্লিষ্ট নয়। বরং দারিদ্র্যের মধ্যে থেকেও তারা মানুষকে
ভালােবাসতে পারে। প্রতিবেশীকে সাহায্য করে। কবি মনুষ্যত্বের অধিকারী এসব
মানুষের সান্নিধ্য পেতে চাইছেন, হারিয়ে যেতে চাইছেন তাদের মাঝে । তিনি মনে
করেন, এরাই হচ্ছে সত্যিকারের মানুষ।
কিবি-পরিচিতি : খুলনা
জেলার তেঁতুলিয়া গ্রামে ১৯১৯ সালের ১৯শে মার্চ সিকান্দার আবু জাফর
জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ মঈনুদ্দীন হাশেমী পেশায় ছিলেন কৃষিজীবী ও
ব্যবসায়ী। সিকান্দার আবু জাফর ১৯৬৬ সালে তালা বি, দে, ইনস্টিটিউশন থেকে
ম্যাট্রিক পাস করেন এবং কলকাতার রিপন কলেজ থেকে আই. এ. পাস করেন। কর্মজীবনে
তিনি ছিলেন সাংবাদিক। দেশ বিভাগের পরে তিনি স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস
করেন। এ সময় তিনি রেডিও পাকিস্তানে চাকরি থেকে শুরু করে দৈনিক ইত্তেফাক,
দৈনিক মিল্লাত, মাসিক সমকাল প্রভৃতি পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন। তিনি
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা আন্দোলন বেগবান করে ভােলার জন্য
তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ
সাংস্কৃতিক কর্মী। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর লেখা আমাদের সংগ্রাম চলবেই
চলবে’ গানটি স্বাধীনতাকামী বাঙালি জাতিকে বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করে। তার
গণসঙ্গীত ও কবিতা মেহনতি মানুষের মুক্তির প্রেরণায় সমৃদ্ধ। সিকান্দার আবু
জাফরের উল্লেখযােগ্য কাব্যগ্রন্থ : প্রসন্ন শহর, বৈরী বৃষ্টিতে,
তিমিরান্তিক, বৃশ্চিক লগ্ন, মালব কৌশিক ইত্যাদি। সাহিত্যকর্মে অবদানের জন্য
তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার ও একুশে পদকে (মরণােত্তর)
ভূষিত হন। ৫ই আগস্ট ১৯৭৫ সালে সিকান্দার আবু জাফর মৃত্যুবরণ করেন।
সৃজনশীল প্রশ্ন
মাদার তেরেসা আশৈশব স্বপ্ন দেখেন মানব সেবার। এক সময় যােগ দেন খ্রিষ্টান
মিশনারি সংঘে। মানুষকে আরাে কাছে থেকে সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে তিনি সন্ন্যাত
গ্রহণ করেন। প্রতিষ্ঠা করেন মিশনারিজ অব চ্যারিটি। তার আদর্শে উজ্জীবিত
হয়ে আরও অনেকেই এগিয়ে আসেন এ মহান কাজে । এক সময় এ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ
তিনি লাভ করেন নােবেল পুরস্কার। সারা জীবনের তার সবটুকু উপার্জনই বিলিয়ে
দেন মানবের কল্যাণে।
ক. কোথায় মানুষেরা নির্ভাবনায় ঘুমিয়ে থাকে?
খ. বিত্ত-সুখের ভাবনাহীন মানুষেরা সংশয়হীন কেন?
গ. মাদার তেরেসার মানসিকতা ‘আশা’ কবিতার যে দিকটিকে তুলে ধরে তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. মাদার তেরেসার দর্শনই যেন ‘আশা’ কবিতার ভাববস্তু’ - যুক্তিসহ প্রমাণ কর।
0 Comments