কিবি-পরিচিতি : রফিক
আজাদ ১৪ই ফেব্রুয়ারি ১৯৪১ সালে টাঙ্গাইল জেলার জাহিদগঞ্জের গুণীগ্রামে
জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা সালিম উদ্দিন খান এবং মাতা রাবেয়া খান। তিনি
১৯৫৯ সালে টাঙ্গাইলের ব্রাহ্মণশাসন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা এবং ১৯৬২
সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
থেকে ১৯৬৬ ও ১৯৬৭ সালে তিনি বাংলা সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি
লাভ করেন। কর্মজীবনে তিনি সাংবাদিকতা, অধ্যাপনা ও সরকারি চাকরিতে নিয়ােজিত
ছিলেন। প্রেম, দ্রোহ ও প্রকৃতিনির্ভর কবিতার এক তাৎপর্যপূর্ণ জগৎ তিনি
সৃষ্টি করেন। তার উল্লেখযােগ্য কাব্যগ্রন্থ : অসম্ভবের পায়ে, চুনিয়া আমার
আর্কেডিয়া, সশস্ত্র সুন্দর, হাতুড়ির নিচে জীবন, পরিকীর্ণ পানশালায় আমার
স্বদেশ, অপর অরণ্যে, বিরিশিরি পর্ব ইত্যাদি। সাহিত্যে অসামান্য অবদানের
জন্য তিনি আলাওল পুরস্কার এবং বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার ও
সম্মাননায় ভূষিত হন। ১২ই মার্চ ২০১৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
স্পর্শ কাতরতাময় এই নাম।
উচ্চারণমাত্র যেন ভেঙে যাবে,
অন্তর্হিত হবে তার প্রকৃত মহিমা, -
চুনিয়া একটি গ্রাম, ছােট্ট - কিন্তু ভেতরে-
ভেতরে খুব শক্তিশালী।
মারণাস্ত্রময় সভ্যতার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে।
মধ্যরাতে চুনিয়া নীরব।
চুনিয়া তাে ভালােবাসে শান্তস্নিগ্ধ পূর্ণিমার চাঁদ,
চুনিয়া প্রকৃত বৌদ্ধ-স্বভাবের নিরিবিলি সবুজ প্রকৃতি;
চুনিয়া যােজনব্যাপী মনােরম আদিবাসী ভূমি।
চুনিয়া কখনো কোনাে হিংস্রতা দ্যাখেনি।
চুনিয়া গুলির শব্দে আঁতকে ওঠে কি?
প্রতিটি গাছের পাতা মনুষ্যপশরি হিংস্রতা দেখে না না করে ওঠে?
-- চুনিয়া মানুষ ভালােবাসে।
বৃক্ষদের সাহচর্যে চুনিয়াবাসীরা প্রকৃত প্রস্তাবে খুব
সুখে আছে।
চুনিয়া এখনাে আছে এই সভ্যসমাজের
কারাে-কারাে মনে,
কেউ-কেউ এখনাে তাে পােষে
বুকের নিভৃতে এক নিবিড় চুনিয়া।
চুনিয়া শুশ্রুষা জ্ঞানে,
চুনিয়া ব্যান্ডেজ বাঁধে, চুনিয়া সান্ত্বনা শুধু -
চুনিয়া কখনাে জানি কারুকেই আঘাত করে না;
চুনিয়া সবুজ খুব, শান্তিপ্রিয় - শান্তি ভালােবাসে,
কাঠুরের প্রতি তাই স্পষ্টতই তীব্র ঘৃণা হানে।
চুনিয়া চিৎকার খুব অপছন্দ করে,
চুনিয়া গুলির শব্দ পছন্দ করে না।
রক্তপাত, সিংহাসন প্রভৃতি বিষয়ে
চুনিয়া ভীষণ অজ্ঞ
চুনিয়া তাে সর্বদাই মানুষের আবিষ্কৃত
মারণাস্ত্রগুলাে
ভূমধ্যসাগরে ফেলে দিতে বলে।
চুনিয়া তাে চায় মানুষেরা তিনভাগ জলে
রক্তমাখা হাত ধুয়ে দীক্ষা নিক।
চুনিয়া সর্বদা বলে পৃথিবীর কুরুক্ষেত্রগুলি
সুগন্ধি ফুলের চাষে ভরে তােলা হােক।
চুনিয়ারও অভিমান আছে,
শিশু ও নারীর প্রতি চুনিয়ার পক্ষপাত আছে;
শিশুহত্যা, নারীহত্যা দেখে দেখে সে-ও
মানবিক সভ্যতার প্রতি খুব বিরূপ হয়েছে।
চুনিয়া নৈরাশ্যবাদী নয়, চুনিয়া তাে মনেপ্রাণে
নিশিদিন আশার পিদিম জ্বেলে রাখে
চুনিয়া বিশ্বাস করে;
শেষাবধি মানুষেরা হিংসা-দ্বেষ ভুলে
পরস্পর সম্প্রতিবেশী হবে।
.
পাঠ -পরিচিতি :
‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কবিতাটি কবি রফিক আজাদের ‘চুনিয়া আমার
আর্কেডিয়া’ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে। এটি একটি প্রতীকী গদ্য কবিতা।
'চুনিয়া নামের একটি গ্রামের প্রতীকের মধ্য দিয়ে কৰি মানুষকে সুন্দরভাবে
বাঁচার আহ্বান জানাচ্ছেন। কবির কথায়, চুনিয়া একটি ছােট্ট আদিবাসী গ্রাম।
শহর থেকে অনেক দূরে এর অবস্থান। মনােরম সবুজ প্রকৃতির পটভূমিতে স্থাপিত
মানবসমাজে আজ যে হিংসা হানাহানি রক্তপাত দেখা যায়, চুনিয়াতে এসব নেই।
সবাই এখানে তাই সুখে থাকে। কবি মনে করেন, প্রতিটি মানুষই আসলে এরকম!
সভ্যসমাজের অনেকেই এই ধরনের সিদ্ধ সুন্দর গ্রামকে অথবা গ্রামের মতাে
পরিবেশকে বুকের মধ্যে লালন করে থাকেন। চুনিয়া বিশ্বাস করে, মানুষ
মারণাস্ত্র ফেলে, হিংসা-দ্বেষ ভুলে পরস্পর সৎ প্রতিবেশী হবে। কেননা মানবতার
পক্ষে দাঁড়ানােই হচ্ছে মানবসভ্যতার মূল কথা।
সৃজনশীল প্রশ্ন - উদ্দীপকটি পড় এবং প্রশ্নগুলাের উত্তর দাও :
জানি নে তাের ধনরতন
আছে কিনা রানির মতন
শুধু জানি আমার অঙ্গ জুড়ায় তােমার ছায়ায় এসে।
ক. ‘অন্তর্হিত’ শব্দের অর্থ কী?
খ. চুনিয়া এখনাে কেন সভ্য সমাজের কারাে কারাে মনে আছে? বুঝিয়ে লেখ।
গ. উদ্দীপকটি ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কবিতার কোন দিককে প্রতিফলিত করেছে - ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকটি ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ কবিতার সমগ্র ভাবকে ধারণ করেনি – মূল্যায়ন কর।
0 Comments