ADD

কপােতাক্ষ নদ -মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 

সতত, হে নদ, তুমি পড় মাের মনে। 
সতত তােমার কথা ভাবি এ বিরলে; 
সতত (যেমতি লােক নিশার স্বপনে। 
শােনে মায়া-মন্ত্রধ্বনি) তব কলকলে 
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে! 
বহু দেশে দেখিয়াছি বহু নদ-দলে, 
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে? 
দুগ্ধ-স্রোতেরূপী তুমি জন্মভূমি-স্তনে। 

আর কি হে হবে দেখা? - যত দিন যাবে, 
প্রজারূপে রাজরূপ সাগরেরে দিতে 
বারি-রূপ কর তুমি; এ মিনতি, গাবে 
বঙ্গজ জনের কানে, সখে, সখা-রীতে 
নাম তার, এ প্রবাসে মজি প্রেম-ভাবে 
লইছে যে তব নাম বঙ্গের সংগীতে। 

শব্দার্থ ও টীকা : সতত-সর্বদা । বিরলে-একান্ত নিরিবিলিতে। নিশ-রাত্রি। ভ্রাঞ্জিভুল। বারি-রূপকর প্রজা যেমন রাজাকে কর বা রাজস্ব দেয়, তেমনি কপােতাক্ষ নদও সাগরকে জলরূপ কর বা রাজস্ব দিচ্ছে। চতুর্দশপদী কবিতা- ইংরেজিতে Sonnet, বাংলায় চতুর্দশপদী কবিতা। চৌদ্দ-চরণ সমন্বিত ভাবসংহত সুনির্দিষ্ট। চতুর্দশপদী কবিতার প্রথম আট চরণের স্তবককে অষ্টক (Octave) এবং পরবর্তী ছয় চরণের স্তবককে ষষ্টক (Sestet) বলে। অষ্টকে মূলত ভাবের প্রবর্তনা এবং ষষ্টকে ভাবের পরিণতি থাকে! চতুর্দশপদী কবিতায় কয়েক প্রকার অন্ত্যমিল প্রচলিত আছে। যেমন, প্রথম আট চরণ : কখখক কখখক। শেষ ছয় চরণ : ঘঙচ ঘঙচ। অথবা প্রথম আট চরণ :কখখগ কখখগ, শেষ ছয় চরণ : ঘঙঘঙ চচ। কপােতাক্ষ নদ’ একটি চতুর্দশপদী কবিতা। এখানে মিলবিন্যাস : কখকখকখখক গঘগঘগঘ।।

পাঠ-পরিচিতি : কপােতাক্ষ নদ' কবিতাটি কবির চতুর্দশপদী কবিতাবলি থেকে গৃহীত হয়েছে। এই কবিতায় কবির স্মৃতিকাতরতার আবরণে তাঁর অত্যুজ্জ্বল দেশপ্রেম প্রকাশিত হয়েছে। কবি যশাের জেলার কপােতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে মধুসূদন এই নদের তীরে প্রাকৃতিক পরিবেশে বড় হয়েছেন। যখন তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন, তখন জন্মভূমির শৈশব-কৈশোরের বেদনা-বিধুর স্মৃতি তাঁর মনে জাগিয়েছে কাতরতা। দূরে বসেও তিনি যেন কপােতাক্ষ নদের কলকল ধ্বনি শুনতে পান। কত দেশে কত নদ-নদী তিনি দেখেছেন, কিন্তু জন্মভূমির এই নদ যেন মায়ের সেহড়ােরে তাঁকে বেঁধেছে, কিছুতেই তিনি তাকে ভুলতে পারেন না। কবির মনে সন্দেহ জাগে, আর কি তিনি এই নদের দেখা পাবেন । কপােতাক্ষ নদের কাছে তার সবিনয় মিনতি-বন্ধুভাবে তাকে তিনি স্নেহাদরে যেমন স্মরণ করেন, কপােতাক্ষও যেন একই প্রেমভাবে তাকে সস্নেহে স্মরণ করে। কপােতাক্ষ নদ যেন তার স্বদেশের জন্য হৃদয়ের কাতরতা বঙ্গবাসীদের নিকট ব্যক্ত করে।

কবি-পরিচিতি : মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে জানুয়ারি যশাের জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলজীবনের শেষে তিনি কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজে অধ্যয়নকালে ইংরেজি সাহিত্যের প্রতি তার তীব্র অনুরাগ জনে। ১৮৪২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন। তখন তাঁর নামের প্রথমে যােগ হয় মাইকেল’। পাশ্চাত্য জীবনযাপনের প্রতি প্রবল আগ্রহ এবং ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি তীব্র আবেগ তাঁকে ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় উদ্বুদ্ধ করে। পরবর্তীকালে জীবনের বিচিত্র কষ্টকর অভিজ্ঞতায় তার এই ভুল ভেঙেছিল। বাংলা ভাষায় কাব্য রচনার মধ্য দিয়ে তাঁর কবিপ্রতিভার যথার্থ ক্ষুর্তি ঘটে। তাঁর অমর কীর্তি মেঘনাদবধ কাব্য। তার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ : তিলােত্তমাসম্ভব কাব্য, বীরাঙ্গনা কাব্য, ব্রজাঙ্গনা কাব্য ও চতুর্দশপদী কবিতাবলি। তাঁর নাটক : কৃষ্ণকুমারী, শর্মিষ্ঠা, পদ্মাবতী; এবং প্রহসন : একেই কি বলে সভ্যতা ও বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ। বাংলা কাব্যে অমিত্রাক্ষর ছন্দ এবং সনেট প্রবর্তন করে তিনি যােগ করেছেন নতুন মাত্রা। ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে জুন কবি লােকগমন করেন।

সৃজনশীল প্রশ্ন  - ছােটকালে ছিলাম বাঙালিদের বালুচরে, সাঁতরায়ে নদী পাড়ি দিতাম বারবার এপার হতে পারে, ডিভি লটারি সুযােগ করে দিলে ছুটে চলে যাই আমেরিকায়। কিন্তু আজ মন শুধু ছটফটায় আর শয়নে স্বপনে বাড়ি দিয়ে যায়, মধুময় স্মৃতিগুলাে আমাকে কাঁদায়, তবু দেশে আর নাহি ফেরা হয়।
ক. সনেটের ষষ্টকে কী থাকে?
খ. ‘স্নেহের তৃষ্ণা বলতে কী বােঝানাে হয়েছে?
গ. উদ্দীপকে প্রতিফলিত অনুভূতি কপােতাক্ষ নদ' কবিতার আলােকে তুলে ধর।
ঘ. উদ্দীপকে প্রতিফলিত অনুভূতির অন্তরালে যে ভাবটি প্রকাশ পেয়েছে তা-ই কপােতাক্ষ নদ' কবিতার মূলভাব’- কথাটির সত্যতা বিচার কর।

Post a Comment

0 Comments