ADD

স্বাধীনতা, এ শব্দটি কীভাবে আমাদের হলাে -নির্মলেন্দু গুণ

 

কিবি-পরিচিতি : নির্মলেন্দু গুণ ১৯৪৫ সালে নেত্রকোনা জেলার কাশবন গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুখেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী এবং মাতা বীণাপানি গুণ। নির্মলেন্দু গুণ ১৯৬২ সালে সিকেপি ইনস্টিটিউশন, বারহাট্টা থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৪ সালে নেত্রকোনা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেন। ষাটের দশকের সূচনা থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত তিনি কবিতায় ও গদ্যে স্বচ্ছন্দে সৃজনশীল হলেও কবি হিসেবেই তিনি খ্যাত। তাঁর কবিতায় প্রতিবাদী চেতনা, সমকালীন সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনের ছবি যেমন প্রখর, কবিতা-নির্মাণে শিল্প-সৌন্দর্যের প্রতিও তেমনি তিনি সজাগ। নির্মলেন্দু গুণ পেশায় সাংবাদিক। কাব্য সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, কবি হাসান হাফিজুর রহমান স্মৃতি স্বর্ণপদক, জাতীয় কবিতা পরিষদ পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হন। তার উল্লেখযােগ্য কাব্যগ্রন্থ : প্রেমাংশুর রক্ত চাই, বাংলার মাটি বাংলার জল, চাষাভূষার কাব্য, পঞ্চাশ সহস্র বর্ষ; ছােটগল্প: আপন দলের মানুষ। ছােটদের জন্য লেখা উপন্যাস : কালােমেঘের ভেলা, বাবা যখন ছােট ছিলেন। 

একটি কবিতা লেখা হবে তার জন্য অপেক্ষার উত্তেজনা নিয়ে 
লক্ষ লক্ষ উন্মত্ত অধীর ব্যাকুল বিদ্রোহী শ্রোতা বসে আছে 
ভাের থেকে জনসমুদ্রের উদ্যান সৈকতে : কখন আসবে কবি? 

এই শিশু পার্ক সেদিন ছিল না, 
এই বৃক্ষে ফুলে শােভিত উদ্যান সেদিন ছিল না, 
এই তন্দ্রাচ্ছন্ন বিবর্ণ বিকেল সেদিন ছিল না। 
তা হলে কেমন ছিল শিশু পার্কে, বেঞ্চে, বৃক্ষে, ফুলের বাগানে 
ঢেকে দেয়া এই টাকার হৃদয় মাঠখানি? 
জানি, সেদিনের সব স্মৃতি মুছে দিতে হয়েছে উদ্যত 
কালাে হাত। তাই দেখি কবিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে আজ 
কবির বিরুদ্ধে কবি, 
মাঠের বিরুদ্ধে মাঠ, 
বিকেলের বিরুদ্ধে বিকেল, 
উদ্যানের বিরুদ্ধে উদ্যান, মার্চের বিরুদ্ধে মার্চ...। 

হে অনাগত শিশু, হে আগামী দিনের কবি, 
শিশু পার্কের রঙিন দোলনায় দোল খেতে খেতে তুমি 
একদিন সব জানতে পারবে; আমি তােমাদের কথা ভেবে 
লিখে রেখে যাচ্ছি সেই শ্রেষ্ঠ বিকেলের গল্প। 

সেদিন এই উদ্যানের রূপ ছিল ভিন্নতর। 
পার্ক না ফুলের বাগান,-এসবের কিছুই ছিল না, 
শুধু একখণ্ড অখণ্ড আকাশ যেরকম, সেরকম দিগন্ত প্লাবিত 
শুধু মাঠ ছিল দূর্বাদলে ঢাকা, সবুজে সবুজময়। 
আমাদের স্বাধীনতা প্রিয় প্রাণের সবুজ এসে মিশেছিল 
এই ধু ধু মাঠের সবুজে। 

কপালে কজিতে লালসালু বেঁধে
এই মাঠে ছুটে এসেছিল কারখানা থেকে লােহার শ্রমিক, 
লাঙল জোয়াল কাঁধে এসেছিল ঝাঁক বেঁধে উলঙ্গ কৃষক, 
হাতের মুঠোয় মৃত্যু, চোখে স্বপ্ন নিয়ে এসেছিল মধ্যবিত্ত, 
নিম্নবিত্ত, করুণ কেরানি, নারী, বৃদ্ধ, ভবঘুরে 
আর তােমাদের মতাে শিশু পাতা-কুড়ানিরা দল বেঁধে। 
একটি কবিতা পড়া হবে, তার জন্য কী ব্যাকুল 
প্রতীক্ষা মানুষের : কখন আসবে কবি? কখন আসবে কবি?' 

শত বছরে শত সগ্রাম শেষে, 
রবীন্দ্রনাথের মতাে দৃপ্ত পায়ে হেঁটে 
অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন। 
তখন পলকে দারুণ ঝলকে তরীতে উঠিল জল, 
হৃদয়ে লাগিল দোলা, জনসমুদ্রে জাগিল জোয়ার 
সকল দুয়ার খোলা। কে রােধে তাঁহার বজ্রকণ্ঠ বাণী? 
গণসূর্যের মঞ্চ কাঁপিয়ে কবি শােনালেন তাঁর অমর কবিতাখানি : 
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, 
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। 

সেই থেকে স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের।


পাঠ-পরিচিতি : শিক্ষার্থীদের মনে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণ, স্বাধীনতা ও দেশপ্রেমের প্রেরণা জাগ্রত করা কবিতাটির উদ্দেশ্য। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু রমনা রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সম্মুখে বজ্রকণ্ঠে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের নিগড় থেকে বাঙালি জাতির মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দেন। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের মধ্যেই সেদিন সূচিত হয়েছিল আমাদের স্বাধীনতার স্বপ্ন ও মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান। সেদিন কৃষক-শ্রমিক-মজুর-বুদ্ধিজীবী-শিশু-কিশাের-নারী-পুরুষ-যুবক-বৃদ্ধ সবাই সমবেত হয়েছিল বাঙালির মহান নেতার কথা শােনার জন্য। সবার মনে ছিল আকুলতা। সে আকুলতা ছিল নেতার কাছে স্বপ্নের কথা শােনার জন্য। তার মুখে আশার বাণী শােনার জন্য। রমনার রেসকোর্সে যেখানে সেদিনের মঞ্চ তৈরি হয়েছিল এখন সেখানে তার কোনাে চিহ্ন নেই। সে জায়গায় গড়ে উঠেছে শিশুপার্ক। কবি মনে করেন, অনাগত কালের শিশুদের কাছে এই কথাটি জানিয়ে দেওয়া দরকার যে এখান থেকেই, এই পার্কের মঞ্চ থেকেই, বাঙালির অমর অজর প্রিয় শব্দ ‘স্বাধীনতা' কথাটি উচ্চারিত হয়েছিল। আপামর জনতার সামনে যিনি সেদিন এসে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি বাঙালির বড় প্রিয় মানুষ, বাঙালির শিকড় থেকে জেগে ওঠা এক বিদ্রোহী নেতা। তিনি কোনাে সাধারণ রাজনীতিবিদ নন, তিনি একজন কবি, একজন রাজনীতির কবি। এ দেশের মানুষের ভালোবাসায় গড়া এক মানুষ - জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সেদিন (৭ই মার্চ ১৯৭১) বিকেলের পড়ন্ত রােদে ডাক দিয়েছিলেন - 
এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সগ্রাম, 
এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। 


সৃজনশীল প্রশ্ন - 
দুলিতেছে তরি ফুলিতেছে জল, ভুলিতেছে মাঝি পথ, 
ছিড়িয়াছে পাল, কে ধরিবে হাল, আছে কার হিম্মৎ? 
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ। 
ক, সব স্মৃতি মুছে দিতে কী উদ্যত? 
খ, ‘ঢেকে দেয়া এই ঢাকার হৃদয় মাঠখানি’ বলতে কী বােঝানাে হয়েছে? 
গ.  উদ্দীপকটি স্বাধীনতা, এ শব্দটি কীভাবে আমাদের হলাে- কবিতার কোন দিককে উন্মােচিত করেছে- ব্যাখ্যা কর। 
ঘ. উদ্দীপকটি স্বাধীনতা, এ শব্দটি কীভাবে আমাদের হলাে- কবিতার সমগ্র ভাবকে ধারণ করেনি- মূল্যায়ন কর।

Post a Comment

0 Comments