ADD

ঝর্ণার গান -সত্যেন্দ্রনাধ দত্ত

 


চপল পায় কেবল ধাই, 
কেবল গাই পরীর গান, 
পুলক মাের সকল গায়, 
বিভােল মাের সকল প্রাণ। 

শিথিল সব শিলার পর 
চরণ থুই দোদুল মন, 
দুপুর-ভাের ঝিঝির ডাক, 
ঝিমায় পথ, ঘুমায় বন। 

বিজন দেশ, কূজন নাই। 
নিজের পায় বাজাই তাল, 
একলা গাই, একলা ধাই, 
দিবস রাত, সাঁঝ সকাল। 

ঝুঁকিয়ে ঘাড় ঝুম-পাহাড় 
ভয় দ্যাখায়, চোখ পাকায়; 
শঙ্কা নাই, সমান যাই, 
টগর-ফুল--নূপুর পায়, 

কোন গিরির হিম ললাট। 
ঘামল মাের উদ্ভবে, 
কোন পরীর টুটুল হার 
কোন নাচের উৎসবে। 

খেয়াল নাই-নাই রে ভাই 
পাই নি তার সংবাদই, 
ধাই লীলায়,-খিলখিলাই 

বুলবুলির বােল সাধি। 
বন-ঝাউয়ের ঝােপগুলায় । 
কালসারের দল চরে, 
শিং শিলায়-শিলার গায়, 

ডালচিনির রং ধরে। 
ঝাঁপিয়ে যাই, লাফিয়ে ধাই, 
দুলিয়ে যাই অচল-ঠাট, 
নাড়িয়ে যাই, বাড়িয়ে যাই-- 

টিলার গায় ডালিম-ফাট। 
শালিক শুক বুলায় মুখ। 
থল-আঁঝির মখমলে, 
জরির জাল আংরাখায় 
অঙ্গ মাের ঝলমলে। 

নিম্নে ধাই, শুনতে পাই 
“ফটিক জল। হাঁকছে কে, 
কণ্ঠাতেই তৃষ্ণা যার 
নিক না সেই পাক ঘেঁকে। 

গরজ যার জল স্যাঁচার 
পাতকুয়ায় যাক না সেই, 
সুন্দরের তৃষ্ণা যার 
আমরা ধাই তার আশেই।

তার খোঁজেই বিরাম নেই 
বিলাই তান-তরল শ্লোক, 
চকোর চায় চন্দ্রমায়, 
আমরা চাই মুগ্ধ-চোখ। 

চপল পায় কেবল ধাই 
উপল-ঘায় দিই ঝিলিক, 
দুল দোলাই মন ভােলাই,
 ঝিলমিলাই দিগ্বিদিক। 

শব্দার্থ ও টীকা : বিভােগ- অচেতন, বিভাের, বিবশ, বিহবল। বিজন- নির্জন, জনশূন্য, নিভৃত। কুজন- কলরব, চিকার, চেঁচামেচি। ঝুম-পাহাড়- নীরব পাহাড়, নির্জন পাহাড়। হিম- তুষার, বরফ, শুক- টিয়ে পাখি। থঙ্গ স্থল। ঝাঝি একপ্রকার জলজ গুল্ম, বহুদিন ধরে জমা শেওলা। মখমল কোমল ও মিহি কাপড়। আংরাখা- লম্বা ও টিলা পােশাকবিশেষ। ফটিক জল’- চাতক পাখি। এই পাখি ডাকলে ফটিক জল’ শব্দের মতাে শােনা যায়। বিলাই বিতরণ করি, পরিবেশন করি (বিলােনাে থেকে)। তান- সুর। তরল শ্লোক- লঘু বা হালকা চালের কবিতা। চকোর- পাখিবিশেষ। কবি-কল্পনা অনুযায়ী এই পাখি চাঁদের আলাে পান করে। চন্দ্রমা- চাদের আলাে। উপল-ঘায় পাথরের আঘাতে। 

পাঠ-পরিচিতি : চঞ্চল পা পুলকিত গতিময়; স্তব্ধ পাথরের বুকে আনন্দের পদচিহ্ন। নির্জন দুপুরে পাখির ডাকও শােনা যায় না। পাহাড় যেন দৈত্যের মতাে ঘাড় ঘুরিয়ে ভয় দেখায়। এত কিছুর মধ্যেও ঝর্ণার চঞ্চল ও আনন্দময় পদধ্বনিতে পর্বত থেকে নেমে আসে সাদা জলরাশির ধারা। চমৎকার এর ধ্বনিমাধুর্য ও বর্ণবৈভব। এই জলধারার যে সৌন্দর্য এবং অমিয় স্বাদ তা তুলনারহিত। গিরি থেকে পতিত এই অম্বুরাশি পাথরের বুকে আঘাত হেনে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে যে অপূর্ব সৌন্দর্যের সৃষ্টি করে তা সত্যি মনােহর।

কিবি-পরিচিতি : ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার কাছাকাছি নিমতা গ্রামে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত জন্মগ্রহণ করেন। তত্ত্ববােধিনী পত্রিকার সম্পাদক ও উনিশ শতকের বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক অক্ষয়কুমার দত্ত ছিলেন তাঁর পিতামহ। সত্যেন্দ্রনাথ বি.এ. শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশােনা করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কাব্যচর্চা করতেন। দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভাষা, ধর্ম ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ের তিনি অনুরাগী ছিলেন। প্রাত্যহিক জীবনে প্রচুর সময় তিনি অধ্যয়ন ও কাব্যানুশীলনে ব্যয় করতেন। সবিতা, সন্ধিক্ষণ, বেণু ও বীণা, হােমশিখা, কুহু ও কেকা, অভ্র-আবীর, বেলাশেষের গান, বিদায় আরতী প্রভৃতি তার মৌলিক কাব্য। তাঁর অনুবাদ কাব্যগুলাের মধ্যে রয়েছে : তীর্থরেণু, তীর্থ-সলিল, ফুলের ফসল প্রভৃতি। বিবিধ উপনিষদ ও কবির, নানক প্রমুখের রচনা এবং আরবি, ফার্সি, চীনা, জাপানি, ইংরেজি, ফরাসি ভাষার অনেক উৎকৃষ্ট কবিতা ও গদ্য রচনা তিনি বাংলায় অনুবাদ করেন। ছন্দ নির্মাণে তিনি অসাধারণ নৈপুণ্যের পরিচয় দিয়েছেন। এজন্য তিনি ‘ছন্দের রাজা’ বলে পরিচিত হন। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে মাত্র চল্লিশ বছর বয়সে তিনি পরলােকগমন করেন। 

সৃজনশীল প্রশ্ন নিসর্গকে হাতের মুঠোয় পুরে দেয়ার তাগিদ থেকে পলাশ সাহেব গড়ে তােলেন এক রমণীয় উদ্যান। বিস্তীর্ণ খােলা মাঠকে সুপরিকল্পিতভাবে তিনি গড়ে তােলেন। পুকুর, দীঘি, হাঁস, গাছপালা, ফুল, পাখির বিচিত্র সমারােহ সৌন্দর্যপিপাসু মানুষ মাত্রকেই আকৃষ্ট করে। অনিন্দ্য সুন্দর এই প্রকৃতিকে শিল্পী তিলােত্তমা করে সাজিয়েছেন শুধুই নিজের খেয়ালে। ব্যক্তিবিশেষ বা কোনাে গােষ্ঠীকে আনন্দ দান নয়, সৌন্দর্যই মুখ্য। বৈরী প্রকৃতি, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে তিনি এ কাজে অগ্রসর হয়েছেন। সৃষ্টির আনন্দই তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে এতটা পথ। 

ক, ঝর্ণা কেমন পায়ে ছুটে চলে? 
খ. শিথিল সব শিলার পর বলতে কবি কী বােঝাতে চেয়েছেন? 
গ. উদ্দীপকের সাথে ঝর্ণার গান’ কবিতার সাদৃশ্যপূর্ণ দিকটি ব্যাখ্যা কর। 
ঘ. উদ্দীপকটি ঝর্ণার গান’ কবিতার মূল বক্তব্যকে কতটুকু ধারণ করে? যুক্তিসহ ব্যাখ্যা কর।


Post a Comment

0 Comments