কিবি-পরিচিতি :
সৈয়দ শামসুল হক ২৭শে ডিসেম্বর ১৯৩৫ সালে কুড়িগ্রাম শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতার নাম ডা. সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন এবং মাতার নাম সৈয়দা হালিমা
খাতুন। তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, জগন্নাথ কলেজ থেকে
ইন্টারমিডিয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কিছুদিন পড়াশােনা করেন।
একসময় পেশায় সাংবাদিকতাকে বেছে নিলেও পরবর্তী সময়ে তিনি সার্বক্ষণিক
সাহিত্যকর্মে নিমগ্ন থেকে বৈচিত্র্যময় সম্ভারে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ
করেছেন। তিনি কবিতা, গল্প, উপন্যাস ও নাটক রচনা করেছেন। তার শিশুতােষ রচনাও
রয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক, বাংলা
একাডেমি পুরস্কারসহ অনেক সাহিত্য-পুরস্কার লাভ করেছেন। তাঁর উল্লেখযােগ্য
গ্রন্থ : একদা এক রাজ্যে, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা, অগ্নি ও জলের কবিতা,
রাজনৈতিক কবিতা, গল্প : শীত বিকেল, রক্তগােলাপ, আনন্দের মৃত্যু, জলেশ্বরীর
গল্পগুলাে; উপন্যাস: বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ; নাটক : পায়ের আওয়াজ পাওয়া
যায়, নূরলদীনের সারাজীবন, ঈর্ষা; শিশুতােষ গ্রন্থ : সীমান্তের সিংহাসন।
২৭শে সেপ্টেম্বর ২০১৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
আমি জন্মেছি বাংলায়, আমি বাংলায় কথা বলি,
আমি বাংলার আলপথ দিয়ে হাজার বছর চলি।
চলি পলিমাটি কোমলে আমার চলার চিহ্ন ফেলে।
তেরােশত নদী শুধায় আমাকে, কোথা থেকে তুমি এলে?
আমি তাে এসেছি চর্যাপদের অক্ষরগুলাে থেকে।
আমি তাে এসেছি সওদাগরের ডিঙার বহর থেকে।
আমি তাে এসেছি কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম থেকে।
আমি তাে এসেছি পালযুগ নামে চিত্রকলার থেকে।
এসেছি বাঙালি পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার থেকে।
এসেছি বাঙালি জোড়বাংলার মন্দির-বেদি থেকে।
এসেছি বাঙালি বরেন্দ্রভূমে সােনা মসজিদ থেকে।
এসেছি বাঙালি আউল-বাউল মাটির দেউল থেকে।
আমি তাে এসেছি সার্বভৌম বারােভূইয়ার থেকে।
আমি তাে এসেছি কমলার দীঘি’, ‘মহুয়ার পালা’ থেকে।
আমি তাে এসেছি তিতুমীর আর হাজী শরিয়ত থেকে।
আমি তাে এসেছি গীতাঞ্জলি ও অগ্নিবীণার থেকে।
এসেছি বাঙালি ক্ষুদিরাম আর সূর্য সেনের থেকে।
এসেছি বাঙালি জয়নুল আর অবন ঠাকুর থেকে।
এসেছি বাঙালি রাষ্ট্রভাষার লাল রাজপথ থেকে।
এসেছি বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর থেকে।
আমি যে এসেছি জয়বাংলার বজ্রকণ্ঠ থেকে।
আমি যে এসেছি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে।
এসেছি আমার পেছনে হাজার চরণচিহ্ন ফেলে।
শুধাও আমাকে এতদূর তুমি কোন প্রেরণায় এলে?
তবে তুমি বুঝি বাঙালি জাতির বীজমন্ত্রটি শােন নাই -
‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।
একসাথে আছি, একসাথে বাচি, আজও একসাথে থাকবই -
সব বিভেদের রেখা মুছে দিয়ে সাম্যের ছবি আঁকবই।
পাঠ-পরিচিতি : সৈয়দ
শামসুল হকের কিশাের কবিতা সমগ্র’ থেকে ‘আমার পরিচয়' শীর্ষক কবিতাটি
সম্পাদিত আকারে চয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন-সার্বভৌম একটি দেশ।
আত্মমর্যাদাবােধ সম্পন্ন এই স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ও জাতিসত্তা
প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে আছে সমৃদ্ধ এক ইতিহাস। সৈয়দ শামসুল হক গভীর মমত্বের
সঙ্গে কবিতার আঙ্গিকে চিত্রিত করেছেন সমৃদ্ধ সেই ইতিহাস, ঐতিহ্য ও
সংস্কৃতির পটভূমি। সহজিয়াপন্থী বৌদ্ধ কবিদের সৃষ্ট চর্যাপদের মধ্যে বাঙালি
জাতিসত্তার যে অসাম্প্রদায়িক জীবনবােধের পরিচয় মুদ্রিত হয়ে আছে - যুগে
যুগে নানা আন্দোলন, বিপ্লব-বিদ্রোহ, আর মতাদর্শের বিকাশ হতে হতে আমরা এসে
পৌঁছেছি আজকের বাংলায়। সৈয়দ শামসুল হক এই বিবর্তনের বিচিত্র বাঁক ও মােড়
তাৎপর্যময় করে তুলেছেন। চাঁদ-সওদাগরের বাণিজ্য যাত্রা, কৈবর্তবিদ্রোহ,
পালযুগের চিত্রকলা আন্দোলন, বৌদ্ধবিহারের জ্ঞানচর্চা, মুসলিম ধর্ম ও
সাহিত্য সংস্কৃতির বিকাশ, বারােভূঁইয়াদের উত্থান, ময়মনসিংহ। গীতিকার
জীবন, তিতুমীর আর হাজী শরীয়তের বিদ্রোহ, রবীন্দ্র-নজরুলের কালজয়ী সৃষ্টি,
ব্রিটিশ-বিরােধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন এবং পরিশেষে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীন
বাংলাদেশ - ‘আমার পরিচয় কবিতার মধ্যে এই বিপুল বাংলাদেশ অনবদ্যরূপ লাভ
করেছে।
সৃজনশীল প্রশ্ন
- ইংরেজ শাসকদের কাছ থেকে উপমহাদেশের মুক্তির জন্য মহাত্মা গান্ধী এক সময়
এদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেন। নানাভাবে তাদের মাঝে দেশপ্রেম জাগ্রত করার
চেষ্টা করেন। এরই ধারাবাহিক ফসল স্বদেশী আন্দোলন, অহিংস আন্দোলন ইত্যাদি।
কালের বিবর্তনে জন্ম পাকিস্তান ও ভারত নামক দুটি পৃথক রাষ্ট্রের এবং
পরবর্তীকালে বাংলাদেশের।
ক. বৌদ্ধবিহার কোথায় অবস্থিত?
খ. ‘আমি তাে এসেছি ‘কমলার দীঘি’, ‘মহুয়ার পালা’ থেকে’ -একথা দ্বারা কবি কী
বােঝাতে চেয়েছেন? গ. উদ্দীপকটি ‘আমার পরিচয় কবিতার সাথে যেদিক দিয়ে
সাদৃশ্যপূর্ণ তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকটি ‘আমার পরিচয়’ কবিতার খণ্ডাংশ মাত্র, পূর্ণচিত্র নয় - যুক্তিসহ লেখ।
0 Comments