ADD

পল্লিজননী -জসীম উদ্‌দীন

 

কবি পরিচিতি : জসীম উদ্‌দীন ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ফরিদপুর জেলার তাম্বুলখানা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কবি তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের পলিপ্রকৃতি ও মানুষের সহজ স্বাভাবিক রূপটি তুলে ধরেছেন। পল্লির মাটি ও মানুষের জীবনচিত্র তাঁর কবিতায় নতুন মাত্রা পেয়েছে। পল্লির মানুষের আশা-স্বপ্ন আনন্দ-বেদনা ও বিরহ- মিলনের এমন আবেগ-মধুর চিত্র আর কোনাে কবির কাব্যে খুঁজে পাওয়া ভার। এ কারণে তিনি পল্লিকবি’ নামে খ্যাত। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি কিছুকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরে সরকারি তথ্য ও প্রচার বিভাগে উচ্চপদে যােগদান করেন। ছাত্রজীবনেই তাঁর কবিপ্রতিভার বিকাশ ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালেই তাঁর রচিত ‘কবর’ কবিতাটি প্রবেশিকা বাংলা সংকলনের অন্তর্ভুক্ত হয়। জসীম উদ্দীনের উল্লেখযােগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে নক্সী কাঁথার মাঠ, সােজনবাদিয়ার ঘাট, রাখালী, বালুচর, হাসু, এক পয়সার বাঁশি, মাটির কান্না ইত্যাদি। তার নক্সী-কাঁথার মাঠ কাব্য বিভিন্ন বিদেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। চলে মুসাফির তার ভ্রমণকাহিনী । বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে। এছাড়া সাহিত্য-সাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি একুশে পদক লাভ করেন। ১৯৭৬ সালের ১৪ই মার্চ কবি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। 



রাত থম থম স্তব্ধ নিঝুম, ঘাের-ঘাের-আন্ধার,
নিশ্বাস ফেলি তাও শােনা যায় নাই কোথা সাড়া কার।
রুগ্‌ণ ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা,
করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন দুলিছে চোখের পাতা।
শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে,
তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে ।
ভন ভন ভন জমাট বেঁধেছে বুননা মশকের গান
এদো ডােবা হতে বহিছে কঠোর পচান পাতার ঘ্রাণ।
 ছােট কুঁড়েঘর, বেড়ার ফাঁকেতে আসিছে শীতের বায়ু,
শিয়রে বসিয়া মনে মনে মাতা গণিছে ছেলের আয়ু।
ছেলে কয়, “মারে, কত রাত আছে, কখন সকাল হবে,
ভাললা যে লাগে না, এমনি করিয়া কেবা শুয়ে থাকে কবে।
মা কয়, বাছারে ! চুপটি করিয়া ঘুমাে ত একটি বার,
ছেলে রেগে কয়, ‘ঘুম যে আসে না কি করিব আমি তার।
পাণ্ডুর গালে চুমাে খায় মাতা। সারা গায়ে দেয় হাত,
পারে যদি বুকে যত স্নেহ আছে ঢেলে দেয় তারি সাথ।
নামাজের ঘরে মােমবাতি মানে, দরগায় মানে দান,
ছেলেরে তাহার ভালাে করে দাও কাঁদে জননীর প্রাণ।
ভালাে করে দাও আল্লা রসুল ভালাে করে দাও পীর,
কহিতে কহিতে মুখখানি ভাসে বহিয়া নয়ন নীর!
বাঁশ বনে বসি ডাকে কানা কুয়াে, রাতের আঁধার ঠেলি,
বাদুড় পাখার বাতাসেতে পড়ে সুপারির বন হেলি।।
চলে বুনাে পথে জোনাকি মেয়েরা কুয়াশা কাফন ধরি,
দুঃ ছাই! কিবা শঙ্কায় মার পরাণ উঠিছে ভরি।
যে কথা ভাবিতে পরাণ শিহরে তাই ভাসে হিয়া কোণে,
বালাই বালাই, ভালাে হবে যাদু মনে মনে জাল বােনে।
ছেলে কয়, “মাগাে, পায়ে পড়ি বল ভালাে যদি হই কাল,
করিমের সাথে খেলিবারে গেলে দিবে না তুমি গাল ।।
আচ্ছা মা বলল, এমন হয় না রহিম চাচার ঝাড়া,
এখনি আমারে এত রােগ হতে করিতে পারে ত খাড়া?
মা কেবল বসি রুগ্‌ণ ছেলের মুখ পানে আঁখি মেলে,
ভাসা ভাসা তার যত কথা যেন সারা প্রাণ দিয়ে গেলে।
‘শােন মা, আমার লাটাই কিন্তু রাখিও যতন করে,
রাখিও তঁাপের মােয়া বেঁধে তুমি সাত-নরি সিকা ভরে।
খেজুরে গুড়ের নয়া পাটালিতে হুডুমের কোলা ভরে।
ফুলঝুরি সিকা সাজাইয়া রেখাে আমার সমুখ পরে।
ছেলে চুপ করে, মাও ধীরে ধীরে মাথায় বুলায় হাত,
বাহিরেতে নাচে জোনাকি আলােয় থম থম কাল রাত ।
রুগ্‌ণ ছেলের শিয়রে বসিয়া কত কথা পড়ে মনে,
কোন দিন সে যে মায়েরে না বলে গিয়াছিল দূর বনে ।
সাঁঝ হয়ে গেল তবু আসে নাকো, আই ঢাই মার প্রাণ,
হঠাৎ শুনিল আসিতেছে ছেলে হর্ষে করিয়া গান।।
এক কোঁচ ভরা বেথুল তাহার ঝামুর ঝুমুর বাজে,
ওরে মুখপােড়া কোথা গিয়াছিলি এমনি এ কালি সাঁঝে।
কত কথা আজ মনে পড়ে তার, গরীবের ঘর তার,
ছােটখাট কত বায়না ছেলের পারে নাই মিটাবার।
আড়ঙের দিনে পুতুল কিনিতে পয়সা জোটেনি তাই,
বলেছে আমরা, মােসলমানের আড়ঙ দেখিতে নাই।
করিম সে গেল? আজিজ চলিল? এমনি প্রশ্ন মালা,
উত্তর দিতে দুখিনী মায়ের দ্বিগুণ বাড়িত জ্বালা।
আজও রােগে তার পথ্য জোটে নি, ওষুধ হয়নি আনা,
ঝড়ে কাপে যেন নীড়ের পাখিটি জড়ায়ে মায়ের ডানা।
ঘরের চালেতে হুতুম ডাকিছে, অকল্যাণ এ সুর,
মরণের দূত এলাে বুঝি হায়, হাঁকে মায়, দূর-দূর।।
পচা ডােবা হতে বিরহিনী ডাক ডাকিতেছে ঝুরি ঝুরি,
কৃষাণ ছেলেরা কালকে তাহার বাচ্চা করেছে চুরি।
ফেরে ভন্ ভন্ মশা দলে দলে, বুড়াে পাতা ঝরে বনে,
ফোটায় ফোঁটায় পাতা-চোয়া জল ঝরিছে তাহার সনে।
রুণ ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা,
সম্মুখে তার ঘোের কুঙ্কুটি মহাকাল রাত পাতা।
পার্শ্বে জ্বলিয়া মাটির প্রদীপ বাতাসে জমায় খেল;
আঁধারের সাথে যুঝিয়া তাহার ফুরায়ে এসেছে তেল।

শব্দার্থ ও টীকা : পচান -- পচে গেছে এমন। নামাজের ঘরে মােমবাতি মানে -- নামাজের ঘর হলাে মসজিদ, মােমবাতি মানে অর্থ হলাে মােমবাতি দেওয়ার মানত করা। কোনাে অসুখ বিসুখ বা বিপদ-আপদ হলে এ দেশের মানুষ তা থেকে উদ্ধার পাওয়ার অভিপ্রায়ে এক ধরনের মানত করে। নামাজের ঘরে মােমবাতি মানে অর্থ হলাে মসজিদে মােমবাতি দেওয়ার প্রতিজ্ঞা বা মানত করা। নয়ন নীর - নয়ন হলাে চোখ, নীর হলাে পানি, নয়নের নীর হলাে চোখের পানি। রহিম চাচার ঝাড়া - আমাদের দেশে রােগ-বালাই থেকে মুক্তি লাভের জন্য পানি পড়া, ঝাড়-ফুকের প্রচলন আছে। নানা ধরনের অসুখে অনেকে পানি পড়ে তা রুগীকে খেতে দেয়, রােগ থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশে। রহিম চাচার ঝাড়া মানে হলাে রহিম চাচার সেই রকম একটি চিকিৎসা পদ্ধতি, যাতে রহিম চাচা রুগী ছেলেটিকে ফু দিয়ে সুস্থ করে তুলবে। আড়ঙের দিনে – আড়ঙ হলাে হাট বা বাজার বা মেলা। আড়ঙের দিনে মানে হলাে মেলার দিনে বা হাটের দিনে বা বাজারের দিনে। 

পাঠ-পরিচিতি : ‘পল্লিজননী’ কবিতাটি কবি জসীম উদদীনের ‘রাখালী’ কাব্যগ্রন্থ থেকে সংকলন করা হয়েছে। মায়ের মতাে মমতাময়ী আর কেউ নেই। রুগণ পুত্রের শিয়রে বসে রাত জাগা এক মায়ের মনঃকষ্ট, পুত্রের চঞ্চলতা স্মরণ আর দারিদ্র্যের কারণে তাকে প্রয়ােজনীয় খাদ্য ও ও আনন্দ-আয়ােজন করতে না পারার ব্যর্থতা এ কবিতায় উল্লেখ করা হয়েছে। পুত্রের শিয়রে নিবুনিবু প্রদীপ, চারিদিকে মশার অত্যাচার, বেড়ার ফাক গলে আসে রাতের শীত। রুগ্ণ পুত্রের ঘুম স্বাভাবিকভাবেই আসে না। মা পুত্রকে আদর করে, তার রােগ ভালাে করে দেবার জন্য দরগায় মানত করে । দুরন্ত ছেলে ভালাে হয়েই খেলতে যাবে এবং তখন মা তাকে কিছু বলতে পারবে না, এমন অঙ্গীকার সে মায়ের কাছ থেকে আদায় করে নেয়। আবদারমুখাে পুত্রের দিকে চেয়ে গ্রামীণ মায়ের মনে অনেক কথা জাগে। তার সামর্থ্য নেই বলে রােগীর ঔষধ, পথ্য কিছুই জোটাতে পারেনি। রুগ্ণ পরিবেশে রােগী সামনে নিয়ে এক পল্লিমায়ের। মনে পুত্র হারানাের শঙ্কা জেগে ওঠে। অপত্যস্নেহে অনিবার্য আকর্ষণই এ কবিতার মূলকথা। 

সৃজনশীল প্রশ্ন 
বাদশা বাবর কাঁদিয়া ফিরিছে, নিদ নাহি চোখে তাঁর 
পুত্র তাহার হুমায়ুন বুঝি বাঁচে না এবার আর । 
চারিধারে তার ঘনায়ে আসিছে মরণ অন্ধকার। 

ক. "পল্লিজননী" কবিতায় ছেলে মাকে কী যত্ন করে রাখার কথা বলেছেন?
খ. ‘আজও রােগে তার পথ্য জোটে নি’ – পথ্য না জোটার কারণ কী? 
গ. উদ্দীপক কবিতাংশে পল্লিজননী’ কবিতার যে দিকটি প্রতিফলিত তা ব্যাখ্যা কর। 
ঘ. প্রতিফলিত দিকটিই ‘পল্লিজননী’ কবিতার সামগ্রিক ভাবকে ধারণ করে কি? যুক্তিসহ প্রমাণ কর।


Post a Comment

0 Comments