বৃষ্টি এলাে ... বহু প্রতীক্ষিত বৃষ্টি ! - পদ্মা মেঘনার
দুপাশে আবাদি গ্রামে, বৃষ্টি এলো পুবের হাওয়ায়,
বিদগ্ধ আকাশ, মাঠ ঢেকে গেল কাজল ছায়ায়;
বিদ্যুৎ-রূপসী পরী মেঘে মেঘে হয়েছে সওয়ার।
দিকদিগন্তের পথে অপরূপ আভা দেখে তার
বর্ষণমুখর দিনে অরণ্যের কেয়া শিহরায়,
রৌদ্র-দ্ধ ধানক্ষেত আজ তার স্পর্শ পেতে চায়,
নদীর ফাটলে বন্যা আনে পূর্ণ প্রাণের জোয়ার।
রুগণ বৃদ্ধ ভিখারির রগ-ওঠা হাতের মতন
রুক্ষ মাঠ আসমান শােনে সেই বর্ষণের সুর,
তৃষিত বনের সাথে জেগে ওঠে তৃষাতস্ত মন,
পাড়ি দিয়ে যেতে চায় বহু পথ, প্রাতর বন্ধুর,
যেখানে বিস্ত দিন পড়ে আছে নিঃসঙ্গ নির্জন
সেখানে বর্ষার মেঘ জাগে আজ বিষন্ন মেদুর ॥
শব্দার্থ ও টীকা :
বিদ্যুৎ রূপসী পরী - বিদ্যুৎ চমকানােকে লােকজ ধারণা অনুযায়ী সুন্দরী পরীর
সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে যে মেঘে মেঘে ঘুরে বেড়ায়। সওয়ার - আরােহী।
রুগ্ণ বৃদ্ধ ভিখারির ... তৃষ্ণাত মন - দীর্ঘ বর্ষণহীন দিনে মাঠঘাট শুকিয়ে
যে রুক্ষ মূর্তি ধারণ করেছে কবি তাকে রুগুণ বৃদ্ধ। ভিখারির রগ-ওঠা হাতের
সঙ্গে তুলনা করেছেন। এখন বর্ষণের শুরুতে তৃষ্ণাকাতর মাঠ-ঘাট ও বনে দেখা
দিয়েছে প্রাণের জোয়ার। তৃষাতপ্ত - পিপাসায় কাতর। বিষন্ন মেদুর -
বৃষ্টিবিহীন প্রকৃতির রুক্ষতা বৃষ্টির আগমনে দূরীভূত হয়েছে। প্রকৃতি এখন
স্নিগ্ধকোমল হয়ে চারিদিক করে। তুলেছে প্রাণােচ্ছ্বল।
পাঠ -পরিচিতি :
প্রকৃতিতে বর্ষা আসে প্রাণস্পন্দন নিয়ে। আর বৃষ্টিই বর্ষার প্রাণ। এ সময়
নদীর দু-ধারে প্লাবন দেখা দেয়, ফলে পলিমাটির গৌরবে ফসল ভালাে হয়।
বৃষ্টির সময় আকাশের সর্বত্র মেঘের খেলা দেখা যায়, বর্ষার ফুল ফুটে
সর্বত্র মােহিত হয়, রুক্ষ মাটি বৃষ্টিতে প্রাণ জুড়ায়। বৃষ্টির দিনে
সংবেদনশীল মানুষও রসসিক্ত হয়ে ওঠে। তার মনে পড়ে সুখময় অতীত, পুরনাে
স্মৃতি, আর সে ভালােলাগার আলপনা আঁকে মনে মনে। এ বৃষ্টি কখনাে বিপ্নও করে
মন, একাকী জীবনে বাড়ায় বিরহ।
কিবি-পরিচিতি : ফররুখ
আহমদ ১৯১৮ সালের ১০ই জুন মাগুরা জেলার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর
পিতা খান সাবের সৈয়দ হাতেম আলী। ফররুখ আহমদ কলকাতা রিপন কলেজ থেকে আই. এ.
পাস করেন এবং কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শনে অনার্স ও ইংরেজিতে
অনার্সের ছাত্র ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষা না দিয়েই কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
কর্মজীবনে তিনি নানা পদে নিয়ােজিত হন এবং ১৯৪৭ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তিনি
ঢাকা বেতারে স্টাফ রাইটার পদে নিয়ােজিত ছিলেন। ইসলামি আদর্শ ও ঐতিহ্য
তাঁকে কাব্যসৃষ্টিতে প্রেরণা জুগিয়েছে। তাঁর উল্লেখযােগ্য গ্রন্থ : সাত
সাগরের মাঝি, সিরাজাম্ মুনীরা, নৌফেল ও হাতেম, মুহূর্তের কবিতা, পাখির
বাসা, হাতেমতায়ী, নতুন লেখা, হরফের ছড়া, ছড়ার আসর ইত্যাদি। সাহিত্যে
অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, আদমজী পুরস্কার, একুশে পদকসহ
(মরণােত্তর) অনেক পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭৪ সালের ১৯শে অক্টোবর তিনি
পরলােকগমন করেন।
সৃজনশীল প্রশ্ন -
কেউবা রঙিন কথায় মেলিয়া বুকের স্বপনখানি,
তারে ভাষা দেয় দীঘল সুতায় মায়াবী আখর টানি।
আজিকে বাহিরে শুধু ক্রন্দন ছলছল জলধারে
বেণু-বনে বায়ু নীড়ে এলােকেশ, মন যেন চায় কারে।
ক. বৃষ্টি’ কবিতায় কোন কোন নদীর কথা উল্লেখ রয়েছে?
খ. রৌদ্র-দগ্ধ ধানক্ষেত আজ বৃষ্টির স্পর্শ পেতে চায় কেন?
গ. ‘বেণু-বনে বায়ু নীড়ে এলােকেশ, মন যেন চায় কারে।’ - উদ্দীপকের এ বক্তব্যের সাথে বৃষ্টি” কবিতার সাদৃশ্যের দিকটি তুলে ধর।
ঘ. উদ্দীপকটি বৃষ্টি’ কবিতার একটা বিশেষ ভাব প্রকাশ করে মাত্র,সমগ্র ভাব নয় -- তােমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।
0 Comments