কিবি-পরিচিতি : কাজী
নজরুল ইসলাম ১১ই জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ সনে (২৪শে মে ১৮৯৯ সালে। ভারতের
পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার আসানসােল মহকুমার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ
করেন। ছেলেবেলায় তিনি লেটো গানের দলে যােগ দেন। পরে বর্ধমানে ও
ময়মনসিংহের ত্রিশাল থানার দরিরামপুর হাই স্কুলে লেখাপড়া করেন। ১৯১৭ সালে
তিনি সেনাবাহিনীর বাঙালি পল্টনে যােগ দিয়ে করাচি যান। সেখানেই তার
সাহিত্য-জীবনের সূচনা ঘটে। তার লেখায় তিনি সামাজিক অবিচার ও পরাধীনতার
বিরুদ্ধে সােচ্চার ছিলেন। এজন্য তাকে বিদ্রোহী কবি বলা হয়। বাংলা সাহিত্য
জগতে তার আবির্ভাব এক নতুন দিগন্তের উন্মােচন করে। কবিতা, উপন্যাস, নাটক,
ছােটগল্প, প্রবন্ধ ইত্যাদি সাহিত্যের সকল শাখায় তিনি প্রতিভার স্বাক্ষর
রেখেছেন। তিনি গজল, খেয়াল ও রাগপ্রধান গান রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন।
আরবি-ফার্সি শব্দের সার্থক ব্যবহার তার কবিতাকে বিশিষ্টতা দান করেছে। মাত্র
চল্লিশ বছর বয়সে কবি দুরারােগ্য রােগে আক্রান্ত হয়ে বাকশক্তি হারিয়ে
ফেলেন। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর অসুস্থ কবিকে ঢাকায় আনা হয় এবং পরে তাকে
বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়। তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয়
কবির মর্যাদায় ভূষিত করা হয়। তার অসাধারণ সাহিত্য-কীর্তির জন্য ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডি.লিট উপাধি প্রদান করে। তাঁর রচিত
কাব্যগুলাের মধ্যে অগ্নি-বীণা, বিষের বাশি, ছায়ানট, প্রলয়শিখা, চক্রবাক,
সিন্ধুহিন্দোল বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য। ব্যথার দান, রিক্তের বেদন,
শিউলিমালা, মৃত্যুক্ষুধা, কুহেলিকা ইত্যাদি তাঁর রচিত গল্প ও উপন্যাস।
যুগবাণী, দুর্দিনের যাত্রী ও রাজবন্দীর জবানবন্দীতার উল্লেখযোেগ্য
প্রবন্ধগ্রন্থ। ২৯শে আগস্ট ১৯৭৬ সালে কবি ঢাকায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ-সংলগ্ন প্রাঙ্গণে তাকে পরিপূর্ণ রাষ্ট্রীয়
মর্যাদায় সমাহিত করা হয়।
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে
মাের মুখ হাসে মাের চোখ হাসে মোের টগবগিয়ে খুন হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
আজকে আমার রুদ্ধ প্রাণের পল্বলে
বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার-ভাঙা কল্লোলে !
আসল হাসি, আসল কাদন,
মুক্তি এলাে, আসল বাঁধন,
মুখ ফুটে আজ বুক ফাটে মাের তিক্ত দুখের সুখ আসে
ঐ রিক্ত বুকের দুখ আসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।।
আসল উদাস, শ্বসল হুতাশ,
সৃষ্টি-ছাড়া বুক-ফাটা শ্বাস,
ফুললাে সাগর দুললাে আকাশ ছুটলাে বাতাস,
গগন ফেটে চক্র ছােটে, পিনাক-পাণির শূল আসে ।
ঐ ধূমকেতু আর উল্কাতে
চায় সৃষ্টিটাকে উল্টাতে,
আজ তাই দেখি আর বক্ষে আমার লক্ষ বাগের ফুল হাসে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
আজ হাসল আগুন, শসল ফাগুন,
মদন মারে খুন-মাখা তূণ,
পলাশ অশােক শিমুল ঘায়েল
ফাগ লাগে ঐ দিক-বাসে
গাে দিগবালিকার পীতবাসে;
আজ রঙন এলাে রক্তপ্রাণের অঙ্গনে মাের চারপাশে
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে !
আজ আসল উষা, সন্ধ্যা, দুপুর,
আসল নিকট, আসল সুদূর,
আসল বাধা-বন্ধ-হাৱা ছদ-মাতন
পাগলা-গাজন-উচ্ছ্বাসে !
ঐ আসল আশিন শিউলি শিথিল
হাসল শিশির দুবঘাসে।
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে !
আজ জাগল সাগর, হাসল মরু,
কাপল ভূধর, কানন-তরু,
বিশ্ব-ডুবান আসল তুফান, উছলে উজান
ভৈরবীদের গান ভাসে,
মাের ডাইনে শিশু সদ্যোজাত জরায়-মরা বামপাশে !
মন ছুটছে গাে আজ বল্ল-হারা অশ্ব যেন পাগলা সে ।
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে !
আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে।
শব্দার্থ ও টীকা : উল্লাস
- পরম (বা চূড়ান্ত) আনন্দ, হৃষ্টতা। সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে - সৃষ্টি করতে
পারার পরম আনন্দ। প - বিল, ক্ষুদ্র জলাশয়। রুদ্ধ প্রাণের পলে- প্রাণের
বদ্ধ জলাশয়ে বা প্রাণ রূপ জলাশয়ে। কল্লোল - জলস্রোতের কলকল শব্দ, মহা
তরঙ্গ বা ঢেউ। রুদ্ধ প্রাগের ... কল্লোলে - প্রাণ রূপ জলাশয়ে দুয়ার ভাঙা
ঢেউ বা তরঙ্গ জোয়ার-এনেছে। স্থল - অগ্নি, হুতাসন। শসল -- নিঃশ্বাস
প্রশ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করল। শাল হুতাশ – অগ্নি নিঃশ্বাস প্রশ্বাস গ্রহণ ও
ত্যাগ করল-অর্থাৎ আগুন অতি তেজের সঙ্গে জ্বলে উঠল। চা - চাকা। এখানে হিন্দু
পুরাণমতে দেবতা বিষ্ণুর হাতে অন্যায় ধ্বংসকারী চাকাকে বােঝানাে হয়েছে।
পিনাক - হিন্দু পুরাণমতে দেবতা শিবের ধনু। পিনাকপাণি – পিনাক পাণিতে (হাতে)
যার, শিব শূল - এখানে হিন্দু পুরাণমতে দেবতা শিবের হাতের ত্রিশূলকে
বােঝানাে হয়েছে। ফাগুন - ফালগুন বা বসন্তকাল। মদ হিদি পরাণমতে প্রেমের
দেবতা। মদন মারে খুন মাখা ভুণ - প্রেমের দেবতা মানুষের হৃদয়ে তীর বিদ্ধ
করেন বলে তা হৃদয়ের রক্ত মাখা বলে মনে করা হচ্ছে। ঘায়েজ - আহত,
আঘাতপ্রাপ্ত। এখানে বসন্তকালের রঙে রঞ্জিত বােঝানাে হয়েছে। ফাগ - আবির,
নানা রঙের গুঁড়াে। গীত -- হলুদ রং, হলদে। দিগৰালিকার পীতবাসে - দিগন্ত রূপ
বালিকার হলুদ রঙের বস্ত্রে বা বসনে। গাঞ্জল – (পুরাণমতে) চৈত্র মাসের শেষে
(অর্থাৎ বসন্তকালে দেবতা শিবকে নিয়ে গান। আশিন- আশ্বিন মাস। দু- দূর্বা,
এক রকমের ঘাস। উছলে উচ্ছলিত। উজান -- স্রোতের বিপরীত দিক। ভৈরবী -- শিব
অনুসারী সন্ন্যাসিনী, ভয়ংকরী। বিডিবাল .... গান ভাসে - স্রোতের বিপরীত দিক
থেকে ঠেলে বিশ ডােবানাে ঝড় এসেছে, তার সঙ্গে তাণ্ডব নৃত্যকারী শিবের
অনুসারী ন্ন্যাসিনীদের গান মিশেছে।
পাঠ-পরিচিতি :
কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কয়েকটি কবিতার অন্যতম একটি হলাে “আজ সৃষ্টি
সুখের উল্লাসে। কবিতাটি তার দোলনচাঁপা কাব্যগ্রন্থ থেকে সংক্ষেপিত আকারে
চয়ন করা হয়েছে। এই কবিতায় কবির সৃষ্টি-সুখের আনন্দ অসাধারণ আবেগ ও
উচ্ছাসের মধ্যে ব্যক্ত হয়েছে। কবির ভাবনায়, বিশ্বাসে ও জাগতিক নিয়মে
এতদিন যা ছিল রুদ্ধ তা যেন আজ শতধারায় উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। সর্বত্রই এখন
তিনি অনুভব করেন সৃষ্টির কোলাহল, গতির উন্মাদনা, প্রাণের উচ্ছ্বাস আর
মুক্তির আনন্দ। এই অফুরন্ত ভাবাবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে কবি যে কাব্যভাষা
প্রয়ােগ করেছেন বাংলা কবিতার ইতিহাসে তা একেবারেই নতুন। এই কবিতার মধ্যে
নজরুলের কাব্য প্রতিভার সকল মাত্রার আনন্দিত প্ৰকাশ লক্ষ করা যায়।
সৃজনশীল প্রশ্ন - গ্রীষ্মের
প্রচণ্ড দাবদাহে মাঠ-ঘাট ফেটে চৌচির। নদী-নালা শুকিয়ে গেছে। সবুজ প্রকৃতি
মৃতপ্রায়। চারিদিকে হাহাকার। হঠাৎ কালাে মেঘে ছেয়ে যায় আকাশ। প্রকৃতি
অবিশ্রান্ত বৃষ্টি-বাদলে যেতে থাকে। সবকিছু যেন নতুন করে প্রাণ পেয়ে আবার
সজীব হয়ে ওঠে। চারিদিকে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করে।
ক, ‘খুন’ শব্দের অর্থ কী?
খ. বান ডেকে ঐ জাগল জোয়ার দুয়ার-ভাঙা কল্লোলে’ – এ কথা দ্বারা কবি কী বুঝিয়েছেন?
গ. উদ্দীপকে ফুটে ওঠা যে বিশেষ দিকটি ‘আজ সৃষ্টি সুখের উল্লাসে’ কবিতার সাথে সম্পর্কযুক্ত তা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকটি ‘আজ সৃষ্টি-সুখের উল্লাসে' কবিতার সমগ্র ভাবকে তুলে ধরে কি? তােমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও।
1 Comments
দারুন পোস্ট।
ReplyDeleteগল্পঃ আহ্বান লেখকঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়