আমার শৈশবের অদ্ভুত স্বপ্নময় কিছুদিন কেটেছে জগদলে। জগদলের দিন আনন্দময়
হবার অনেকগুলাে কারণের প্রধান কারণ স্কুলের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি। সেখানে
কোনাে স্কুল নেই। কাজেই পড়াশােনার যন্ত্রণা নেই। মুক্তির মহানন্দ।
আমরা থাকি এক মহারাজার বসতবাড়িতে, যে-বাড়ির মালিক অল্প কিছুদিন আগেই দেশ
ছেড়ে ইন্ডিয়াতে চলে গেছেন। বাড়ি চলে এসেছে পাকিস্তান সরকারের হাতে।
মহারাজার বিশাল এবং প্রাচীন বাড়ির একতলায় আমাদের থাকার ব্যবস্থা। দোতলাটা
তালাবদ্ধ। শুধু দুতলা নয়, কয়েকটা ঘর ছাড়া বাকি সবটা তালাবদ্ধ, কারণ
মহারাজা জিনিসপত্র কিছুই নিয়ে যান নি। ঐসব ঘরে তার জিনিসপত্র রাখা।
ঐ মহারাজার নাম আমার জানা নেই। মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনিও বলতে পারলেন
না। তবে তিনি যে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী ছিলেন তার অসংখ্য প্রমাণ এই বাড়িতে
ছড়ানো। জঙ্গলের ভেতর বাড়ি। সেই বাড়িতে ইলেকট্রিসিটির ব্যবস্থা করার জন্য
তাঁর ছিল নিজস্ব জেনারেটর। দাওয়াতের চিঠি ছেপে পাঠানাের জন্যে মিনি
সাইজের একটা ছাপাখানা।
বাবাকে অসংখ্যবার বলতে শুনেছি- মহারাজার রুচি দেখে মুগ্ধ হতে হয়। আহা, কত বই! কত বিচিত্র ধরনের বই।
বিকেলগুলিও কম রােমাঞ্চকর ছিল না। প্রতিদিনই বাবা কাঁধে গুলিভরা বন্দুক
নিয়ে বলতেন-চল বনে বেড়াতে যাই। কাঁধে বন্দুক নেয়ার কারণ হচ্ছে প্রায়ই
বাঘ বের হয়। বিশেষ করে চিতাবাঘ ।।
বাবার সঙ্গে সন্ধ্যা পর্যন্ত বনে ঘুরতাম। ক্লান্ত হয়ে ফিরতাম রাতে। ভাত
খাওয়ার আগেই ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসত। কত বিচিত্র শব্দ আসত বন থেকে। আনন্দে
এবং আতঙ্কে শিউরে শিউরে উঠতাম। একদিন কাঁপুনি দিয়ে আমার এলাে জ্বর।
বাবা-মা দুজনেরই মুখ শুকিয়ে গেল-- লক্ষণ ভালাে নয়। নিশ্চয় ম্যালেরিয়া।
সেই সময়ে এই অঞ্চলে ম্যালেরিয়া কুখ্যাত ছিল।
একবার কাউকে ধরলে তার জীবনীশক্তি পুরােপুরি নিঃশেষ করে দিত। ম্যালেরিয়ায়
মৃত্যু ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। আমরা প্রতিষেধক হিসেবে ৫ বায়ােকেমিক ওষুধ
ছাড়াও প্রতি রবিবারে পাঁচ গ্রেন করে কুইনাইন খাচ্ছি। তার পরও ম্যালেরিয়া
ধরবে কেন?
বাবা এই ভয়ংকর জায়গা থেকে বদলির জন্য চেষ্টা-তদবির করতে লাগলেন। শুনে
আমার মন ভেঙে গেল। এত সুন্দর জায়গা, এমন চমৎকার জীবন-- এসব ছেড়ে কোথায়
যাব? ম্যালেরিয়ায় মরতে হলেও এখানেই মরব। তাছাড়া ম্যালেরিয়া অসুখটা আমার
বেশ পছন্দ হলাে। যখন জ্বর আসে তখন কী প্রচণ্ড শীতই-না লাগে! শীতের জন্যেই
বােধহয় শরীরে এক ধরনের আবেশ সৃষ্টি হয়। জ্বর যখন বাড়তে থাকে তখন চোখের
সামনের প্রতিটি জিনিস আকৃতিতে ছােট হতে থাকে। দেখতে বড় অদ্ভুত লাগে। এক
সময় নিজেকে বিশাল দৈত্যের মতাে মনে হয়। কী আশ্চর্য অনুভূতি।
.
শুধু আমি একা নই, পালা করে আমরা সব ভাইবােন জ্বরে পড়তে লাগলাম। একজন জ্বর
থেকে উঠতেই অন্যজন জ্বরে পড়ে। জ্বর আসেও খুব নিয়মিত। আমরা সবাই জানি কখন
জ্বর আসবে। সেই সময়ে লেপ-কাঁথা গায়ে জড়িয়ে আগেভাগেই বিছানায় শুয়ে
পড়ি।। প্রতিদিন ভােরে তিন ভাইবােন রাজবাড়ির মন্দিরের চাতালে বসে রােদ
গায়ে মাখি। এই সময় আমাদের সঙ্গ দেয় বেঙ্গল টাইগার । বেঙ্গল টাইগার হচ্ছে
আমাদের কুকুরের নাম। না, আমাদের কুকুর নয়, মহারাজার কুকুর। তার নাকি
অনেকগুলাে কুকুর ছিল। তিনি সবকটাকে নিয়ে যান, কিন্তু এই কুকুরটিকে নিতে
পারেন নি। সে কিছুতেই রাজবাড়ি ছেড়ে যেতে রাজি হয় নি।
মা তাকে দুবেলা খাবার দেন। মাটিতে খাবার ঢেলে দিলে সে খায় না। থালায় করে
দিতে হয়। শুধু তা-ই না, খাবার দেবার পর তাকে মুখে বলতে হয়- খাও।
খানদানি কুকুর। আদব-কায়দা খুব ভালাে। তবে বয়সের ভারে সে কাবু। সারা দিন
বাড়ির সামনে শুয়ে থাকে। হাই তােলে, ঝিমুতে ঝিমুতে মৃত্যুর জন্যে অপেক্ষা
করে।
এক ভােরবেলার কথা। আমার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। আমি কম্বল গায়ে দিয়ে
মন্দিরের চাতালে বসে আছি। আমার সঙ্গে শেফু এবং ইকবাল। মা এসে আমাদের
মাঝখানে শাহীনকে (আমার ছােট ভাই) বসিয়ে দিয়ে গেলেন। আমাদের দায়িত্ব
হচ্ছে তার দিকে নজর রাখা, সে যেন হামাগুড়ি দিয়ে চাতাল থেকে পড়ে না যায়
।
মা চলে যাবার পরপরই হিসহিস শব্দে পেছনে ফিরে তাকালাম। যে-দৃশ্য দেখলাম
সে-দৃশ্য দেখার জন্য মানসিক প্রস্তুতি আমার ছিল না। মন্দিরের বন্ধ দরজার
ফাক দিয়ে প্রকাণ্ড একটা কেউটে সাপ বের হয়ে আসছে। মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসে।
ফণা তুলে এদিক-ওদিক দেখছে, আবার মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসছে, আবার ফণা তােলে।
আমরা তিন ভাইবােন ছিটকে সরে গেলাম। শাহীন একা বসে রইল, সাপ দেখে তার
আনন্দের সীমা নেই। সে চেষ্টা করছে সাপটির দিকে এগিয়ে যেতে। আর তখনই বেঙ্গল
টাইগার ঝাঁপিয়ে পড়ল সাপটির ওপর। ঘটনা এত দ্রুত ঘটল যে আমরা কয়েক
মুহূর্ত বুঝতেই পারলাম না কী হচ্ছে। একসময় শুধু দেখলাম কুকুরটা সাপের ফণা
কামড়ে ছিড়ে ফেলেছে। বেঙ্গল টাইগার ফিরে যাচ্ছে নিজের জায়গায়। যেন কিছুই
হয়নি। নিজের স্বাভাবিক কর্মকাণ্ড সে শেষ করল।
সাপ কুকুরটিকে কামড়াবার সুযােগ পেয়েছিল কি না জানি না। সম্ভবত
কামড়ায়নি। কারণ কুকুরটি বেঁচে রইল, তবে নড়াচড়া পুরােপুরি বন্ধ করে
দিল।
দ্বিতীয় দিনে তার চামড়া খসে পড়ল এবং দগদগে ঘা দেখা দিল। এ থেকে মনে হয়
সাপ সম্ভবত কামড়েছে। সাপের বিষ কুকুরের ক্ষেত্রে হয়তাে তেমন ভয়াবহ নয়।
আরও দুদিন কাটল। কুকুরটি চোখের সামনে পচেগলে যাচ্ছে। তার কাতরধ্বনি সহ্য
করা মুশকিল। গা থেকে গলিত মাংসের দুর্গন্ধ আসছে। বাবা মাকে ডেকে বললেন, আমি
এর কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। তুমি বন্দুক বের করে আমাকে দাও। বাবা আমাদের
চেখের সামনে পরপর দুটি গুলি করে কুকুরটিকে মারলেন। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম
বাবা দুঃখ বেদনায় কুঁকড়ে উঠেছেন। তবু শান্ত গলায় বললেন, যে আমার ছেলের
জীবন রক্ষা করেছে তাকে আমি গুলি করে মারলাম। একে বলি নিয়তি।।
কিন্তু আমার কাছে বাবাকে পৃথিবীর নিষ্ঠুরতম মানুষদের একজন বলে মনে হলাে।
নিজেকে কিছুতেই বােঝাতে পারছিলাম না এমন একটি কাজ তিনি কী করে করতে পারলেন।
রাগে, দুঃখে ও অভিমানে রাতে ভাত না খেয়ে শুয়ে পড়েছি। বাবা আমাকে ডেকে
নিয়ে বারান্দায় বসালেন।
দুজন চুপচাপ বসে আছি। চারদিকে ঘন অন্ধকার। তক্ষক ডাকছে। বাড়ির চারপাশের আমের বনে হাওয়া লেগে বিচিত্র শব্দ উঠছে।
বাবা কিছুই বললেন না। হয়তাে অনেক কিছুই তার মনে ছিল। মনের ভাব প্রকাশ করতে
পারলেন না। একসময় বললেন, যাও ঘুমিয়ে পড়াে। আমি সেদিন বুঝতে পারিনি বাবা
কেন কুকুরটিকে কুকুরটি আমার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল।
শব্দার্থ ও টীকা : অত-
চমৎকার, অসাধারণ। মহানন্দ- গভীর আনন্দ, অনেক আনন্দ। আবেশ ভাবাবেগ, অনুরাগ,
এখানে এক ধরনের মানসিক প্রতিক্রিয়া বােঝানাে হয়েছে। চাতাল- উঠান, শান
বাঁধানাে বসার জায়গা। তক্ষক- এক ধরনের অত্যন্ত বিষধর সাপ।
পাঠ - পরিচিতি :
বাংলাদেশের নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থ
‘আমার ছেলেবেলা’ থেকে ‘নিয়তি’ নামক গল্পটি সংকলিত হয়েছে। লেখকের
ছােটবেলায় বাবার চাকরিসূত্রে জগদলের একটি পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে
অবস্থানকালীন স্মৃতি এবং তার অনুভূতি অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে এখানে বর্ণনা
করা হয়েছে। জমিদারবাড়ির কুকুরটি লেখকের ছােট ভাইকে কেউটে সাপের ছােবল
থেকে রক্ষা করে। সাপটিকে মেরে ফেললেও কুকুরটিও সাপের কামড় খায়। সাপের
কামড়ের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত কুকুরটির পরবর্তী যন্ত্রণা সহ্য করতে না
পেরে তার বাবা কুকুরটিকে গুলি করে মেরে ফেলেন। কুকুরের এই নিয়তি তার বালক
চিত্তে বেদনার সঞ্চার করে।
লেখক-পরিচিতি : হুমায়ূন
আহমেদ ১৩ই নভেম্বর ১৯৪৮ সালে নেত্রকোনার মােহনগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর
বাবা ফয়জার রহমান আহমেদ এবং মায়ের নাম- আয়শা ফয়েজ। হুমায়ুন আহমেদ ১৯৬৫
সালে বগুড়া জেলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৬৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ
মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৭০ ও ১৯৭২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন
বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু হয়। কিন্তু
সাহিত্যচর্চার জন্য অধ্যাপনা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। তিনি
কথা-সাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে বিপুল খ্যাতি অর্জন
করেন। তিনি প্রায় দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত উল্লেখযােগ্য
উপন্যাস : নন্দিত নরকে, নীল অপরাজিতা, প্রিয়তমেষু, জয়জয়ন্তী, অয়ােময়,
এলেবেলে ইত্যাদি। তাঁর নির্মিত উল্লেখযােগ্য চলচ্চিত্র : শঙ্খনীল কারাগার,
আগুনের পরশমণি, শ্যামল ছায়া, শ্রাবণ মেঘের দিন, ঘেঁটুপুত্র কমলা ইত্যাদি।
তিনি একুশে পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন। ক্লোন ক্যান্সারে
আক্রান্ত হয়ে ২০১২ সালের ১৯শে জুলাই এই নন্দিত লেখক মৃত্যুবরণ করেন।
সৃজনশীল প্রশ্ন
আলী আব্বাসের প্রিয় ঘােড়া দুলকি। এর নাম-ডাক বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত।
তাই একে নিজের সম্পদে পরিণত করার আগ্রহ অনেকেরই। আব্বাস একদা দুলকিকে নিয়ে
শিকারে যায় গভীর বনে । এ সুযােগে দস্যুরা তাকে চারদিক দিয়ে ঘিরে ফেলে।
মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও সে দৌড়ে আসে দুলকির কাছে। মনিবের জীবন বাঁচাতে দুলকি
তাকে নিয়ে জীবনপণ দৌড় শুরু করে। দস্যুরাও তার পেছন পেছন ছােটে। গর্জে
ওঠে তাদের বন্দুক। মনিবকে নিয়ে নিরাপদে ফিরে এলেও গুলিবিদ্ধ দুলকি অবশেষে
মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
ক. কোন জায়গায় লেখকের শৈশবের অদ্ভুত স্বপ্নময় দিনগুলাে কেটেছে?
খ. বাবা এই ভয়ংকর জায়গা থেকে বদলির জন্য চেষ্টা করছেন। জায়গাটিকে ভয়ংকর বলার কারণ কী?
গ. উদ্দীপকের দুলকি এবং ‘নিয়তি’ গল্পের বেঙ্গল টাইগার-এর মধ্যকার সাদৃশ্যের দিকটি তুলে ধর।
ঘ, ‘প্রাণীর প্রতি মমত্ববােধ থাকলেও উদ্দীপকের আলী আব্বাস ও নিয়তি গল্পের লেখকের বাবার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন।'- মন্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।
1 Comments
Question diya labh ki and na dile question to boi tei ase plzz ai srijonshil ar answer ta den
ReplyDelete